Showing posts with label না গল্প না কবিতা. Show all posts
Showing posts with label না গল্প না কবিতা. Show all posts

Tuesday, 5 June 2012

তারে স্মরণ ও করি না/ স্বপনেও দেখি না আমি/ এ আমি সঙ্গে সঙ্গে/ এই অঙ্গে অঙ্গে রাখি আমি সারাক্ষণ

আমার উচ্চতায় ভয়। চারতলা বাড়ির ছাদের রেলিং দিয়ে নিচের দিকে তাকালেও ভয় লাগে, তলপেট কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, বুক ঢিপঢিপ। সেদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে আন্দুলের দিকে যাওয়া অনেকটা উঁচু ফ্লাইওভারের রেলিংএর ধারে গিয়ে ভয়ে ভয়ে দাঁড়াই। নিচের দিকে তাকিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফ্লাইওভার আর তার মাঝে মাঝে আরও নিচে ফাঁকা জায়গা, সরু রাস্তার দিকে দেখতে গিয়ে আজ কেন কে জানে ভয় করল না। বরং ফ্লাইওভারের ফাঁক-ফোকরে পড়ে থাকা  নিচের ফাঁকা জমি, এঁকে বেঁকে এগিয়ে যাওয়া সরু রাস্তা যেন আমায় ডাকল! একটা শিরশিরে ভাব.. অনেক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি নিচের দিকে, একটুও ভয় করে না আর..

আমরা প্রতিদিনই কতবার নিচে নামি, উপরে উঠি। সিঁড়ি দিয়ে নামি, কেউ কেউ লিফ্‌টে করে নামেন, ব্রিজ থেকে নামি, আবার উঠিও। যে সিঁড়ি দিয়ে নামি, সেই সিঁড়ি দিয়েই আবার উপরেও উঠে আসি, এতে নতুন কিছু নেই। কেউ কোনো খারাপ কাজ করলে বা করে থাকলে আমরা বলি, অমুক কত নিচে নেমে গেছে, বা গিয়েছিল। সেই একই মানুষ কোনো ভাল কাজ করলে কী আমরা বলি যে অমুক বা এই মানুষটা কত উপরে উঠে গেছে? হয়ত কেউ কেউ বলে থাকেন, আমি জানি না। এই উপরে ওঠা বা নিচে নামা- একই শব্দ অথচ কত তফাৎ এর ব্যবহারিক অর্থে!


 ০২
তারে স্মরণ ও করি না/ স্বপনেও দেখি না আমি/ এ আমি সঙ্গে সঙ্গে/ এই অঙ্গে অঙ্গে রাখি আমি সারাক্ষণ- কফিল আহমেদ

আর যাব না ঠাকুরবাড়ি/ আমার রাধার নাইরে শাড়ি- গানটি সম্ভবত কফিল আহমেদেরই লেখা, সুর করা আর গাওয়া তো বটেই। সম্ববত এজন্যে বললাম, উনি গান বাঁধেন, গান করেন, কিন্তু ঠিক এই গানটি ওনারই লেখা কিনা ঠিক জানি না। সাগরকে জিজ্ঞেস করলে এক্ষুণি জানতে পারা যায় কিন্তু কি দরকার.. এমন কিছু জরুরী তো নয়.. অনেকদিন, অনেকবার গানটি অনেকভাবে অনেক জায়গায় শুনেছি, কফিল আহমেদ নিজেও গেয়ে শুনিয়েছেন। প্রতিবারেই একটা প্রশ্ন মাথায় জেগেছে, ঠাকুরবাড়ি কেন? অন্য কোনো জায়গা বা বাড়ি নয় কেন? দিন দুই ধরে থেকে থেকেই প্রশ্নটা গোত্তা মারছে মাথায়। কফিল আহমেদের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতে হবে..


০৩
পুরানো সেই দিনের কথা সে কি ভোলা যায়
স্মৃতি যে সততই মধুর হয় এমনটা নয়। প্রচুর টক-ঝাল-নোনতা-মিষ্টি স্মৃতিদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে অনেক অনেক তিক্ত স্মৃতিও। চিরতার পানির চাইতেও বেশি তেতো হয় কখনও কখনও সেসব। তবুও মনে পড়ে। হঠাৎ হঠাৎ আপনা থেকেই। কোনো ছোট্ট একটা টুকরো কথা বা কোনো জিনিস খুলে দেয় স্মৃতির পুরো ঝাঁপিটাকে। যা হয়ত মনে করতে চাই না, দুঃস্বপ্নেও দেখতে চাই না। আবার কখনও বা কেউ মনে করিয়ে দেয়, খেই ধরিয়ে দেয় মনের গহীন কোনো অন্দরে ঘুমিয়ে থাকা, কোনো ভুলে যাওয়া বা ভুলতে চাওয়া স্মৃতি-ঘটনা। বহুকাল আগে একটা কথা শুনেছিলাম, গ্রাম্য এক প্রবাদ- ছোট্ট এক পিঁপড়ের কামড় নাকি কখনও কখনও চেপে থাকা সাপের বিষকে জাগিয়ে দেয়। আমরা ভাবি, যে দিন গেছে, সে গেছে। ফুরিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে। কিন্তু যায় কী আসলেই?   

যায় না। কিছুই হারায় না। যখন তখন ফিরে আসে। কখন, কীভাবে-কেউ জানে না... জীবনের ধন নাকি কিছুই যায় না ফেলা.. স্মৃতিও তেমনি, কিছুই হারায় না, হারিয়ে যায় না..


০৪
আমার এই জ্বরবেলা
আমার বড় জ্বর হয়। জীবন জুড়িয়া কেবলি জ্বর। মাঝে-মধ্যে জ্বর থাকে না, তখন ঘুরে বেড়াই, দৌড়ে বেড়াই। একটু বেশিই দৌড়ে বেড়াই। কারণে বা অকারণে। আবার জ্বর হয়, আবার আমার নক্‌শী কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা, ক্যাল্‌পোল বা ক্রসিন ট্যাব। জ্বরের ফাঁকে ফাঁকেই সংসার, ছেলে-মেয়ে। কাঁথাটা এমনিতে সারাবছরই বিছানায় থাকে, ভাঁজ করা, বিছানার ধার ধরে। এবার শীত পড়ার সময়ে সে যে খাটের ভেতরকার বাক্‌সে ঢুকেছে আর বেরোয়নি। এখন আমার গায়ে মায়ের দেওয়া নক্কশী চাদর। গোটা চাদর জুড়ে কাঁথার ফোঁড়ে ফুল, লতা পাতার রংবাহারি নক্‌শা। বেশ মোটা চাদরটা, দুভাঁজে গায়ে থাকলে আর ঠান্ডা লাগে না। কাঁথার মতো ওম নেই যদিও কিন্তু মায়ের দেওয়া চাদরে যেন মায়ের হাতের ছোঁওয়া লেগে আছে এখনও। সেবার বাড়িতে গিয়ে আম্মার খাটে পাতা এই চাদরটা দেখে জানতে চেয়েছিলাম, কে করেছে কাজটা? বড় সুন্দর! কার একটা নাম যেন বলেছিল আম্মা, যাকে দিয়ে চাদরে কাজটা করিয়েছে। জিজ্ঞেস করলো, তুমার পছন্দ হইছে চাদরটা? 'বড় সুন্দর' বলাতে সঙ্গে সঙ্গেই বিছানায় পাতা চাদরটা তুলে ভাঁজ করে আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিল আম্মা বারবার বারণ করা সত্বেও।

জ্বরটা এমনি এমনি  হয়। কারণে বা অকারণে, যখন তখন। কখনো ভালুকজ্বর তো কখনো ঘুসঘুসে। দুঃখু পেলে জ্বর হয়,  কষ্ট পেলে হয়, কোনো ভাবনা চিন্তা একটু চেপে বসলে জ্বর হয়, ঠান্ডা লেগে সর্দিজর, সিজন চেঞ্জ ইত্যাদি বা ম্যালেরিয়াও আছে। সে সব অবশ্য কম-বেশি সকলেরই হয়। আমার বাড়ির সকলেই মোটামুটি এইসব জ্বর-জ্বালা নিয়ে অভ্যস্ত বলে কেউই খুব একটা মাথা ঘামায় না এখন আর। বাবা-মা বা ভাই বোনেরা খবর পেলে অবশ্য চিন্তায় পড়ে যায়, তবে বেশির ভাগ সময়েই ওরা জানতে পারে না। রোজ রোজ কত আর অসুখ অসুখ করব।  ফোনে বোন তবু গলার আওয়াজে বুঝে যায়, বলে, তোমার এমন বারো মাসই জ্বর থাকে কেন? যখনই ফোন করি, তোমার জ্বর! বললাম, না না, বারো মাসই থাকে এমন নয়, মাঝে মধ্যেই জ্বর থাকে নাঃ-)  

জ্বর হলে বড় মা
কে মনে পড়ে। ছেলেবেলাকে মনে পড়ে। হয়ত বড়বেলার সব জ্বরে তো একলা থাকার বেলা বা পালা বলেই মাকে বেশি বেশি করে মনে পড়ে। ছেলেবেলায় হওয়া জ্বর আর মা। নরম করে রাঁধা গরম ভাতে পানি দিয়ে কচলে ভাতটা ফেলে দিয়ে সেই পানিতে নুন আর লেবুর রস দিয়ে চামচে করে খাইয়ে দেওয়া। বিছানার ধার ধরে অয়েলক্লথ পেতে তাতে বালিশ রেখে সেই বালিশে শুইয়ে মাথায় পানি ঢালা, মাথা এপাশ ওপাশ করিয়ে ঘাড় অব্দি ধুইয়ে দেওয়া, মাঝে মধ্যেই মিশ্র মশলার গন্ধ মাখা ভেজা হাতে মুখ মুছে দেওয়া, হাতের আঁজলায় করে পানি নিয়ে দুই চোখেও পানি দেওয়া আর ততক্ষণ পানি ঢালতেই থাকা যতক্ষণ জ্বর না নামছে। তখন, হাতের ওই মশলার গন্ধ বড় নাকে লাগত। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিয়ে আঁচলে করে মুখ.. 

..
বুকের ভেতর দলা পাকায় কষ্ট, কবে কখন কোথায় যে হারালো মধুর সেই জ্বরবেলা ..

Tuesday, 28 June 2011

অনিন্দ্য রাত্রিপ্রাঙ্গণে

একটা ঘুড়ি উড়ছিল একটু আগেও। নাটাই হাতে হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটি ঘুড়িটাকে পাকা নাচিয়ে হাতে ওড়াচ্ছিল। তারপরই ভোঁকাট্টা, এখন একলা হয়ে ঝুলে আছে গাছের ডালে। বৃষ্টিহাওয়া ঘুড়িটাকে ওর কাছ থেকে আলাদা করে উড়িয়ে এনে বসিয়ে দিয়েছে অন্য জায়গায়, সে এখন বৃষ্টিতে ভিজছে আর বোকা বোকা চোখে ওর ভিজতে থাকা নেতিয়ে পড়া গোলাপী-সাদা ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। গলির মুখে আটকে যাওয়া অনেকের সাথে নীল সালওয়ার-কামিজ বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে মাথায় তুলে দিচ্ছে আকাশনীল ওড়নার আড়াল। সেঁটে যাচ্ছে আরও বেশী করে দেয়ালের সাথে। মুঠোফোনে তাড়া দেওয়া প্রেমিককে এইমাত্র রাগীমুখে যেন ধমকে উঠল সে, তারপর ফোন ব্যাগে পুরে অখন্ড মনোযোগ ঢেলে দিল মুখ আর হাতের বিন্দু বিন্দু জলকণার প্রতি।


বারান্দায় দাঁড়িয়ে এইসব দৃশ্য দেখি আর ভেতরে ভেতরে কাঙাল হয়ে উঠি। খন্ড খন্ড আবেগ বিক্ষিপ্ত হয়ে মিশে যেতে চায় অঝোর বৃষ্টির সাথে। আমার একলা লাগতে আরম্ভ করলে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে চিলেকোঠায় উঠি। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকি পলেস্তাবা খসে যাওয়া দেয়ালের ইতিউতি থেকে যাওয়া স্মৃতিমাখা দাগগুলোর দিকে। বৃষ্টির ছাঁট আসছে খোলা দরজা দিয়ে। ছাদে গিয়ে দাঁড়াই, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার কষ্টগুলোকে স্নান করাতে থাকি। ছাদে নেমে আসে বৃষ্টিগন্ধা প্রবল আকাঙ্খার এক সন্ধ্যা। দাঁতে দাঁত কামড়ে কষ্টগুলোকে আড়াল করি, সযত্নে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে ছাদ থেকে নেমে আসি চুপচাপ।




বৃষ্টির তোড় কমে না, তার মধ্যে বার দুয়েক আমাকে বর্ষাতি পরে বেরোতে হয় আলু,লঙ্কা, ডিম আনতে। এনে দিই, সিগারেট ফুরিয়েছিল সেটাও মনে করে কিনি। ঘরে ঢুকে দেখি রিনি সুখী সুখী মুখে খিচুড়ি রাঁধছে। ইলিশ নেই বলে ডিম কষা, আর আলুভাজা করবে বলে রান্নাঘর থেকেই জানান দেয়। বৃষ্টিশব্দ ছাপিয়ে ওর চুড়ির টুং টাং আওয়াজ আর মশলার ঝাঁঝালো গন্ধ দুইই আমার ইন্দ্রিয়ে অস্বস্তি এনে দিলে আমি বসার ঘরে বসে কিছুক্ষণ দৈনিক পত্রিকার হেডলাইন পুনরায় মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করি, হঠাৎ মনের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে ওঠে কেউ, একটা বৃষ্টিভেজা আবছা মুখ জলের ভেতর থেকে মুখ তুলে ফের ডুবে যায় হুস করে। আমি তার ফিসফিস করে বলা কথা শুনতে কান পাতি বুকের গভীরে। তার ভেতরে ডুব দেবার প্রবল তৃষ্ণার অনুভব আমাকে ভেতর থেকে নিয়ে যায় দূরালোকে। ক্রমশ তার স্পর্শ অনুভব করতে শুরু করি ঘাড়ে, কপালে,চুলে।রিনি এসে রাতের খাবার খেতে ডাকে। ওর ডাকে ঘোরের সুতো ছিঁড়ে যায়। দুম করে সুতো কেটে যাওয়া ঘুড়ির মত আচমকা ঝুলতে থাকি শূন্যে।




খাবার পরে সারা ঘরে ঝাঁ ঝাঁ আলো জ্বেলে রিনি রাতের প্রসাধন সারে আর আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। সিগারেটে লম্বা ছাই জমে, হৃদস্পন্দনের মধ্যে ফের অনুভব করি তাকে। রাস্তায় জল জমে গেছে, আলোর প্রতিবিম্ব জলে দোল খায় আর ঝিকমিক করে সেসবের মধ্যে দেখতে পাই ছেঁড়া ছেঁড়া স্থিরমুহূর্তকে। খুঁটে তুলে নিই এক এক করে স্মৃতিদৃশ্য, জমিয়ে রাখি পাঁজরের প্রতি খাঁজে। ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে পুরোনো ঠিকানায় ফিরে যাই। এক বছর আগের বৈদ্যুতিন চিঠিগুলো ঘুরেফিরে পড়ি। দুজনের কথপোকথনগুলো উল্টেপাল্টে দেখি। হু হু করে ওঠে বুকের ভেতর, বৃষ্টিস্নানের পর পুনরায় জমিয়ে রাখা কষ্টগুলো, পুরুষত্ববোধের তলায় চাপা পড়া কষ্টগুলো এবার গলতে শুরু করে। বেরিয়ে আসে ওরা নোনাজল হয়ে। প্রবল তোড়ে আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে বৃষ্টির সাথে মিশে যেতে যেতে আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়।


ছায়াশরীরী দক্ষ সে তীরন্দাজ ফেলে গেছে বৃষ্টির বধ্যভূমিতে
তার অনিশ্চিত ফেরার প্রতীক্ষায় বৃষ্টিজলে মুখ রেখে অস্ফুটে বলি
ভস্ম হয়ে মিশে যাবো বাতাসে তবু ছড়িয়ে দেবো স্ফুলিঙ্গ চারদিকে
অস্থিটুকু পুঁতে দিও বাগানে; পুনশ্চঃ জন্ম নেবে এক শ্বেতকরবী।

Tuesday, 7 June 2011

অজেয় ডানার ছন্দবিদ্যুত


হাওয়া এসে পর্দা উড়িয়ে দিলে আমি চমকে তাকিয়ে দেখি আকাশ একেবারে কালো হয়ে উঠেছে। দূরে মেঘের গায়ে গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু সুপারীগাছ। জানলা দিয়েই দত্তবাড়ির পুকুরঘাট নজরে পড়ে। দত্তদের মেয়েটা একা পুকুরঘাটে বসে আছে, আচমকা মনে একটা ভয় উঠে এল, আলো নিভে যাওয়া দুপুরে ও একা বসে কেন? কোনো দূর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে কি! একটা সাময়িক অস্বস্তি শুরু হয়েই আবার পরমুহূর্তেই বুদ্বুদের মত ছড়িয়ে যেতে যেতে ক্রমে মিলিয়ে যেতে থাকল, মনে পড়ে গেল মৃত্তিকা প্রায়ই বলে বিভ্রান্তিতেই নাকি আরও এক যুগ কেটে যাবে আমার!

উঠোন থেকে মাত্র দু’ধাপ উঠলেই বারান্দা। মৃত্তিকা দৌড়ে দৌড়ে উঠোনে যাচ্ছে আর রোদে শুকোতে দেওয়া কাপড়, বড়ি, আচার এনে বারান্দায় তুলছে। ঘরের ভেতর থেকে দেখছি ওকে, মনে হচ্ছে একটা চন্দনা পাখি নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। হাওয়ার জোর বাড়ছে, হাওয়ার সাথে ঘরে ঢুকে পড়ছে বৃষ্টিগন্ধ, পর্দাগুলো হাওয়ার দাপটে জড়িয়ে যেতে যেতেই টেবিলে রাখা জলের গেলাস দিল উলটে। সদ্য লিখতে থাকা কবিতাটা টুপ করে ডুবে গেল জলের মধ্যে। কড়াৎ করে একটা বাজ পড়ার আওয়াজ আর তখুনি মৃত্তিকা দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। সাথে সাথেই শুরু হল ঝড়। মৃত্তিকা ঝড় ভয় পায়। ঝড় এলে ও বরাবর একেবারে বুকের কাছে সেঁটে যায়। ওকে কাছে টানতে টানতেই চোখের কোণ দিয়ে বন্ধ জানলার কাঁচের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি চলে গেল পুকুরঘাটে। কী আশ্চর্য! মেয়েটা এখনও পুকুরঘাটে এই তান্ডবের মধ্যে, একলা। কেন?

ঝড় থেমে গিয়ে এখন শান্ত সব, শুধু কার্নিশ থেকে জানলার কাঁচে টুপটাপ জল চুঁইয়ে পড়ার হালকা মোহন শব্দ। পাশে মৃত্তিকা ঘুমিয়ে পড়েছে। কবিতার কথা মনে হতে নিজের মধ্যে ঝড়জনিত অবসাদ নিয়ে উঠে বসলাম। জন্মমুহূর্তেই মৃত্যু ঘটে যাওয়া কবিতার পাতা একলা হয়ে জলে ভাসছে। ক্লান্তিতে ভর করেই জানলা খুলে দিতে গিয়ে আবার চোখ চলে গেল পুকুর ঘাটে। জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে। গাছের পাতাগুলো জলে ভিজে একেবারে সতেজ হয়ে উঠেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আবার মৃত্তিকার গভীর ঘুমে থাকা মুখটার দিকে তাকাতেই মনের মধ্যে সেই পুরোনো ইচ্ছার ঘাই মেরে ওঠা টের পেলাম।

রাতে খাবার পালা শেষ। আকাশ গুমড়ে উঠছে বারবার। বোধহয় আকাশ আবার ভেঙে বৃষ্টি নামবে এখুনি। মৃত্তিকা সাদা-সবুজ দুটো বড়ি টেবিলে ফেলে দিয়ে বলল : খেয়ে নাও। তারপর চলে গেল সব গুছিয়ে রাখতে। আমার বুকের মধ্যে মেঘ জমতে শুরু করল। ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ধরে রেখে ড্রয়ারের গোপনতম চোরাকুঠুরী থেকে বের করলাম টিনের চৌকো কৌটোটা। সব মিলিয়ে পঁচানব্বইটা বড়ি। সবসময় লুকোতে পারি না। কখনও মৃত্তিকা সামনে দাঁড়িয়ে খাওয়ায়। তখন বাধ্য ছেলের মত দুটো বড়িই গিলে ফেলি। আর ও কাছে পিঠে না থাকলে সবুজ গোল বড়িটা লুকিয়ে রাখি কৌটোতে। সবুজ বড়িটাই সেই বড়ি যেটা খেলে অনেক আনন্দ হয়। মাথার মধ্যে হুটোপাটি করে আলোর মশাল। তারপর ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়ে ওঠে মন, শরীর। ঘুমের মধ্যে কেবল তখন তলিয়ে যাওয়া। অনেকদিন ধরে আস্তে-ধীরে আমার কবিতাদের মত বড়িগুলোকে সাজিয়ে রেখেছি এই কৌটোয়। প্রথমটায় অবশ্য জানতাম না কোনটা খেলে ঠিক এরকম লাগে। তারপর আলাদা করে একদিন সাদা বড়ি আরেকদিন সবুজ বড়ি খেতে গিয়ে মজাটা বুঝে গেছি।

মৃত্তিকা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ। ঘুমন্ত মুখটা দেখে মনেই হচ্ছে না একটু আগে ও কীরকম রেগে গিয়েছিল! কেন আমি ওষুধ খেয়েও ঘুমোতে যাচ্ছি না সেই রাগে ও অন্যপাশ ফিরে শুয়েছে। আর আমি জলের গেলাস হাতে ওর মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি। মৃত্তিকাকে বলা হল না যে কোনো বিভ্রম নয়। সুচেতা, মানে দত্তবাড়ির ওই মেয়েটা অলীক কিছু নয়। ওকে আমি দেখতে পাই ও এখনও আছে বলে। এরকম এক ঝড়জলের দুপুরে যা ঘটবার ঘটে গেছিল। সুচেতা কেন এসেছিল সেদিন এখন আর মনে করতে পারি না। ভুলে গেছি পূর্বপরিচয়ে কোনো প্রণয় ছিল কিনা! কিন্তু সেই ঘটনাটা মনে আছে। আর মনে আছে পুরো বিকেল এই পুকুরঘাটে বসে থেকে সন্ধেবেলায় ও ডুবে যায় ওই পুকুরে। তারপরই ও পরী হয়ে যায়। আর আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে, আর ইচ্ছে হলেই যখন তখন পুকুরঘাটে গিয়ে বসে।
৬.
গেলাসের জল শেষ। মাথার মধ্যে আলোর ঘূর্ণিপাক। মৃত্তিকা মুখ একটু কুঁচকে ঠোঁট নেড়ে পাশ ফিরছে দেখছি, কিন্তু ওর মুখ থেকে শব্দটা ধরতে পারছি না। কোথায় যেন তলিয়ে গেল শব্দটা..যেতে যেতে মিলিয়ে গেল। মৃত্তিকার মুখটা কি সুন্দর লাগছে। সুচেতাও কখন যেন ওর পাশে এসে বসেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে ওদের দুজনকে দেখি। স্পষ্ট শুনতে পাই আমার জলবিষাদের পরী সুচেতা বলছে :


এবার নাও অপেক্ষাব্রত, প্রকৃত মৃত্যুহীনতা…
অপেক্ষার মৃত্যু নেই কোনো - জেনে
সত্যাসত্য মানিনি, আমি ভাঙনমুখী-
স্মৃতির আবহ ভেঙে, কোথাও তো যেতে পারিনি
চরাচরে মেলে দিই অজেয় ডানার ছন্দবিদ্যুত।



[পঙক্তি : তুহিন দাসের ‘বনসাই প্রকল্পের মানুষ’ কাব্যগ্রন্থের ‘নেপথ্য-ছায়া’ কবিতা থেকে]


মেঘ