Showing posts with label সৃতিচারন. Show all posts
Showing posts with label সৃতিচারন. Show all posts

Friday, 28 September 2012

জ্বরবেলাঃ একাল ও সেকাল

দিনকাল কত বদলে গেছে কিন্তু কিছু জিনিস এখনও বদলায়নি। বদলায়নি আমার ঠকঠকিয়ে কাঁপুনি দিয়ে ভালুকজ্বর আসা। ছেলেবেলার মত মনে হওয়া যে -দাঁতকপাটি লাগছে, ভেতরে ভেতরে অসম্ভব কাঁপুনি, অথচ শরীর কাঁপে না একটুও। জ্বরের ঘোরে মুহূর্তে মুহূর্তে চমকে ওঠা, ভয় পাওয়া, মনে হওয়া যে কারা যেন ঘরের মধ্যে হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে। ঘোরের মধ্যে চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়দের ঘুরে বেড়ানো, গোল গোল ঝিলিমিলি আলো, এঁকে-বেঁকে যাওয়া সব রামধনু আলো, খুব কান্না পাওয়া, আব্বার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়া, আম্মার মশলার গন্ধওয়ালা হাত আর আঁচল খোঁজা –যা ভিজিয়ে আম্মা জ্বরতপ্ত মুখ-গলা, হাত-পা মুছিয়ে দিত, তপ্ত দুই চোখের উপর রেখে দিত সেই আঁচল, প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ পাওয়ার ইচ্ছেগুলো বদলায়নি একটুও...

যা বদলেছে -এখন জ্বর এলে ইন্দোদাদা-কে একটা ফোন করি, ইন্দোদাদা ওষুধ বলে দেয়, কখনও কিছু পরীক্ষা করতে বলে, কখনও শুধু ওষুধ বলে দেয়,বাবু সেগুলো লিখে নেয়। সেই ওষুধ একবার মাত্র খেলেই জ্বর ‘নরম' হয়ে যায়। -এই ‘জ্বর নরম’ কথাটা আমার দাদি বলত।  ওষুধ খেয়ে দু'দিনের মাথায় আমি হেঁটে-চলে বেড়াই, ঘরের কাজ-কম্ম করি, ফেসবুকে নোট লিখতে বসি। ইন্দোদাদার ফোনে বাৎলানো বিধান অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে ওআরএস খাওয়ার ফলে দুর্বলতাও থাকে না। আমার ছেলে বলে –ইন্দো ডাক্তার জিন্দাবাদ!

ডাক্তার প্রসঙ্গে গতকাল রাত থেকেই মনে পড়ছে আমাদের গাঁয়ের এক ডাক্তারবাবুর কথা। এক বর্ষাকালের কথা, অনেক চেষ্টা করেও আমি সেই ডাক্তারবাবুর নাম মনে করতে পারছি না। বহু বহু বছর আগের কথা। সেবছর ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কিছুতেই আব্বা-আম্মার সঙ্গে সিলেট ফিরতে চাইলাম না। আরও একটা সপ্তা থেকে যাওয়ার জন্যে রাত থেকেই কান্নাকাটি, সকাল হতেই দাদির খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা, স্কুল শুরু হতে এখনও তো এক সপ্তাহ বাকি, কাকা নাহয় পৌঁছে দিয়ে আসবে গিয়ে। শেষমেশ দাদির কথায় আব্বা রাজী হল রেখে যেতে। আমিও বেরিয়ে আসি খাটের তলা থেকে। ভরা বর্ষা। চারিদিকে থৈ থৈ পানি, একটুখানি জেগে আছে শুধু পুকুরের পারগুলো আর বড় রাস্তা অব্দি যাওয়ার কাঁচা সড়ক।

রোদের দেখা নেই, সারাদিন আকাশের মুখ ভার হয়ে থাকে, থেকে থেকেই অঝোর বৃষ্টি। পুকুরের পশ্চিমপারের বাঁশঝাঁড়ের ওধারের খালে টলটলে জল, জলের ভেতর দেখা যায় শ্যাওলায় ঢাকা নানান রকমের লতা-গুল্ম। মনে প্রবল বাসনা, এই খালে নেমে সাঁতার কাটব, বারবার বাড়ির দিকে তাকাই, কাকা কোথায়? কদ্দূর গেছে? দেখতে বা জানতে পেলে আর রক্ষে নেই –এই ভেবে নিজেকে বিরত রাখি খালে নামা থেকে। খানিক দূরে তাকালেই ডুবে যাওয়া সব ক্ষেত-খামার, মৃদু বাতাসে ঢেউ খেলা টলটলে জল, আকাশের মেঘের ছায়া পরে যা কালচে দেখায়। আরেকটু দূরে নজর করে তাকালে দেখা যায় শাপলা বিল। গোটা বিল জুড়ে শাপলা ফুটে থাকে বলে বিলের নামই শাপলাবিল। যেদিন আকাশ একটু পরিষ্কার থাকে, বৃষ্টি থেমে যায়, দাদিকে বললেই বিকেল বেলায় মজিদ ভাইকে নিয়ে নৌকায় করে শাপলা বিলে যাই আমি আর দাদি। দাদি সঙ্গে নেয় রেডিও। নৌকার ধারে বসে আমি টেনে টেনে সব শাপলা তুলি, শালুক খুঁজি, পুড়িয়ে খাব বলে। দাদি ভয় দেখায়, পানির দিনে নাকি সাপেরা থাকার জায়গা পায় না তখন এই সব শাপলাদের গায়ে গায়ে বিষওয়ালা সাপেরা সব জড়িয়ে থাকে, একবার কামড়ে দিলেই শেষ! খানিক শান্ত হয়ে বসে থাকা আবার শাপলা টেনে টেনে নৌকা ভর্তি করা।

সমস্ত দিনে অসংখ্যবার পুকুরে স্নান, পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আরও অনেক রকম কাজ-কর্ম করে সন্ধে হলেই চাচির বিছানায়। থালায় ভাত নিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পাখির ডিম, মুরগির ডিম, ময়নার ডিম সব খাওয়ায় চাচি আর গল্প শোনায়। কখন যেন ডিমগুলো সব শেষ হয়ে যায়! চাচি উঠে যায় থালা নিয়ে, আমি গিয়ে দাদির বিছানায় দাদির কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ি। দাদি খানিক গল্প বলে, বিবিদের কিস্‌সা, নবী-রাসুলদের গল্প, আজুজ-মাজুজের কিস্‌সা। এক একদিন একটা গল্প। দাদির হাতে সমানে ঘোরে বাড়িতে বোনা তালপাতার পাখা। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যেও দাদি কেমন করে যেন সারারাত পাখা ঘোরায়। একটুও গরম লাগে না আমার!

কাকা বাড়ি না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা পুকুরে পড়ে থাকতাম। বাড়ি গেলেই চাচির কাপড়কাটা কাঁচি নিয়ে মাথার চুলের গোছা ধরে কচ কচ করে সব চুল কেটে ফেলতাম, পিঠ অব্দি লম্বা চুল ভিজে থাকে, জলদি শুকায় না, আর কাকা বাড়ি এসে সবার আগে চুলেই হাত দেয়, চুল বিকেল অব্দি ভেজা থাকা মানেই সারাদিন আমি পুকুরে ছিলাম! ছোট চুল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় বলে এভাবে চুল আমি প্রত্যেকবারেই কেটে ফেলি, যখনই বাড়ি যাই। এবড়ো-খেবড়ো চুল চাচি পরে সমান করে ছেঁটে দেয় ছেলেদের মতন করে। কাকার কাছে তবুও রক্ষে নেই, ছোট চুল দেখলেই বুঝে যায় কেন এই চুল কাটা হল। মারে না যদিও কিন্তু চোখ লাল করে এমনভাবে তাকায় যে শরীরের সব সব রক্ত পানি হয়ে যায় দুই মিনিটেই! চাচির পেছনে গিয়ে চাচির কোমর জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ কাকার গজগজানি শোনা যায়। প্রত্যেক বার একটাই কথা দিয়ে থামে, ‘বর্ষাইত্যা পানি, জ্বর-জারি হইলে ডাক্তর পামু কই? এই শয়তানেরে ভাইসাবে কিয়ের লাইগ্যা যে থুইয়া গেসে আল্লায় জানে! বারে বারে কইসি, লগে লইয়া যান, বাড়িত থাকলে কেউর কতা হোনে না!’

এবং জ্বর আসে। ধুম জ্বর। ঘরে ঘরে তখন থার্মোমিটার থাকে না, আমাদের বাড়িতে যদিও ছিল কিন্তু চাচির ছেলের আবার পারদ ভীষণ পছন্দ! থার্মোমিটার বাড়িতে এলেই ধান্দায় থাকে, কতক্ষণে ওটা হাতে পাওয়া যাবে। পারদকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আবার জুড়ে দেওয়া, গোটা পারদটাকে খাতার পাতা ছিঁড়ে তাতে তুলে নিতে আমার যে ভাল লাগে না এমন নয় কিন্তু একটা আস্ত থার্মোমিটার আমি ভেঙ্গে ফেলি না পারদের জন্যে। ওগুলো ভাইয়া আর চাচির ছেলে জুন্নুনের কাজ। পারদ দিয়ে খেলা চলে অতএব জ্বর কত দেখার উপায় নেই।

এদিকে পানি বাড়ছে দিনে চার আঙ্গুল তো রাতে আট আঙ্গুল। এগুলো কাকার হিসেব। তাঁর চিন্তা পুকুর আর পুকুরের মাছেদের নিয়ে।  পুকুরের পার ডোবে ডোবে অবস্থা। বড় রাস্তায় যাওয়ার যে একমাত্র সড়ক সে নাকি অনেক জায়গাতেই ডুবে গেছে। কাকা সারাদিন ব্যস্ত জাল দিয়ে গোটা পুকুর ঘেরায়, প্রচুর মাছ আছে পুকুরে, একটা পার ডোবা মানেই সমস্ত মাছ বেরিয়ে প্রথমে খালে আর তারপর যে যেদিকে পারে ছুট লাগাবে। সারা রাত কাকা একহাতে পাঁচ ব্যটারির বড় টর্চ অন্য হাতে লাঠি নিয়ে  পুকুর পারে ঘুরে ঘুরে খালের জল মাপে। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার জ্বর। দাদি সারাদিন বসে থাকে মাথার কাছে, কপালে-গলায় হাত দিয়ে জ্বএ দেখে, বুঝতে না পেরে নিজের গাল ঠেকায় আমার গালে কপালে, বলে, ‘খৈ ফুটতাসে গো জ্বরে!’ মাথায় পট্টি দেয় আর গজগজ করে, ‘মিন্টুইন্যা যে বকে তোরে এমনি এমনি বকে? অহন ভোগান্তিডা কার অইত্যাসে?’

বিছানার উপরে অয়েলক্লথ বিছিয়ে মাথা বিছানার কিনারায় রেখে মেঝেতে রাখে বড় গামলা, তারপর কলসির পর কলসি পানি ঢালি চাচি দিনে দু-তিনবার করে। জ্বর খানিকটা নামে, আবার ধুম জ্বর। বাজারে বসেন সেই ডাক্তারবাবু। গ্রামের একমাত্র ডাক্তার। এলএমএফ ডাক্তার। কাকা নৌকায় করে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। কাগজ কেটে দাগ দিয়ে আঠা দিয়ে আটকানো কাঁচের শিশিতে রাখা লাল রঙের মিক্সচার, কাগজে মোড়ানো সাদা সাদা বড়ি। যেমনি তেতো সেই মিক্সচার, ঠিক ততখানিই তেতো সেই সাদা বড়ি, খেলেই ওয়াক আসে। গাছের গন্ধরাজ লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ায় চাচি, আমি খেয়েই হড়হড়িয়ে বমি করি। আবার ঝিম মেরে পড়ে থাকি। চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়। লাল, নীল, সোনালী, হলুদ। কখনও তারা ঘুরে বেড়ায় ঘরময়, কখনও স্থির দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সমুখে। একই আকারের থাকে না আলোগুলো। ভাংচুর চলতেই থাকে। কখনো লম্বা রেখা হয়ে ঘুরে বেড়ায় আশে-পাশে, আবার কখনও সাতরঙা রামধনু হয়ে যায়।

আমি আলো দেখে দেখে ক্লান্ত। ভয় লাগে। আম্মার কাছে যেতে চাই। কাকা এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দাদি দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি খাওয়ায়, আমি আবার বমি করি। ঘোরের মধ্যে মনে হয় যেন চোয়াল দুটো ঢুকে যাচ্ছে একটার ভেতর আরেকটা। যেন দাঁত কপাটি লাগছে। কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি শুরু হয় গোটা শরীর জুড়ে। প্রচণ্ড ভয় লাগে, জানি, একবার কথা বলে ফেলতে পারলেই চলে যাবে এই কাঁপুনি, চোয়াল খুলে যাবে কিন্তু পারি না, স্বর ফোটে না। চোখ দিয়ে জল গড়ায় আপনা থেকেই। একসময় থামে কাঁপুনি, খুলে যায় চোয়াল, শক্ত করে চাচিকে ধরে থাকি, ‘চাচিআম্মা, আমার ডর করে।’ বিছানা থেকে তুলে কোলে নিয়ে বসে চাচি। কাকাকে বলে, ‘বিকালে গিয়া ডাক্তরবাবুরে লইয়া আইও, আমার ভালা ঠেকত্যাসে না, ভাইসাবেরে খবর দ্যাও।’

ডাক্তারবাবু আসেন। পরনে হাফহাতা সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতি, বিশাল লম্বা ঢ্যাঙ্গা চেহারা, ধনুকের মতন বাঁকানো নাক। দাদার কাছাকাছি বয়েস কিন্তু দাদার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। ছোটোখাটো কিছু হলে কাকা গিয়ে বলে ওষুধ নিয়ে আসে, অসুখ সেরে যায়, বাড়াবাড়ি হলে কাকা গিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে তাঁকে। আমাদের বাড়ি থেকে দেড়মাইল দূরের বাজারে তাঁর ওষুধের ডিসপেন্সারি, ওখানে বসেই রোগীও দেখেন। এমনি দিনে দেড় মাইল দূরের বাজার থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহনিয়ে হেঁটে চলে আসেন, কাকা হেঁটে পারে না তাঁর সঙ্গে, কিন্তু এই বন্যায় বড় রাস্তা থেকে  আমাদের বাড়ি অব্দি একমাইলের  কাঁচা সড়ক পানির তলায়, কাকা নৌকা করে যায়, বেঁধে রাখে রাস্তার ধারে খালে অন্য আরও অনেক নৌকার সঙ্গে, খাল যেখান থেকে এগিয়ে গেছে তিতাসের দিকে।

পরপর তিনদিন আসেন সেই ডাক্তার। সেই একই রকম ফতুয়া আর ধুতি পরনে, পায়ে রাবারের চটি। রোজ এসে একই কথা জিজ্ঞেস করেন, ‘খুকুমণির জ্বর ছাড়ে না কিয়ের লাইগ্যা?’ প্রথম দিন এসেই বুকে স্টেথো রেখে দেখে নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা, দাদি, কাকা, চাচি সবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘জলে ডুবাইয়া ডুবাইয়া খুকুমণি কফ জমাইসইন বুকত, সারতে সমো লাগবো গো মেন্টু মিঞা।’ শুনেই জোরে চোখ টিপে বন্ধ করে ফেলি আমি, কাকার হিমঠাণ্ডা চোখে যেন আমার চোখ কিছুতেই না পড়ে! কাগজে মোড়ানো সাদা বড়ি, একটা মিক্সচারের সঙ্গে যোগ হয় আরো তেতো এক মিক্সচার, ছদিনের মাথায় জ্বর ছাড়ে।

রেডিওতে দাদি-কাকা খবর শোনে, বন্যায় নাকি রেললাইনও ডুবে গেছে। আমি ভাবি, বাঁচা গেছে, এই সপ্তায় অন্তত কাকা আমাকে নিয়ে যেতে পারবেই না সিলেট! গোসলের সময় কাকা দাঁড়িয়ে থাকে পুকুর পারে, নো সাঁতার কাটা, নো ডুবা-ডুবি, তিনখান ডুব দাও তারপর সিধে উঠে আসো গামছা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকার কাছে! কাকা যা বলে, চুপচাপ করি সেগুলো, মনে ভাবি, কদিন আর চোখে চোখে রাখবে, দু-এক দিন যাক তারপর দেখা যাবে...

Thursday, 2 August 2012

প্রিয় বাবার প্রতি ভালবাসা



প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালবাসা কোন দিবসের উপর নির্ভর করে না। তবুও দিবসগুলো আমাদের অন্তত কিছু ভাললাগা স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, কিছু অমূল্য সময়কে মনে করিয়ে দেয়, যা কেটেছে ঐ প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। বাবা দিবস বলে কখনও কোন দিবস পালন করিনি। বিশেষ কোন আয়োজন হয়নি। বাবাকে গলা জড়িয়ে বলা হয়নি, “বাবা তোমাকে ভালবাসি”। কেন যেন মনে হয় যে, এতোটা যান্ত্রিক এখনও হয়ত হইনি, যতটা যান্ত্রিক হলে বাবার জন্য আলাদা সময় বের করতে হয়।

আমার বাবাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি সমাজ, সভ্যতা, ধর্মীয় জ্ঞান থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু আমাদের দুই ভাইবোনকে হাতে ধরে ধরে শেখাতেন। যদিও সময় খুব কম পেতেন, প্রতিদিন আব্বু যখন উনার ব্যবসার উদ্দেশে ঘর থেকে বের হতেন, আমরা ঘুমিয়ে থাকতাম। আবার যখন বাড়ি ফিরতেন গভীর রাতে তখনও আমরা ঘুমাতাম। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এবং কলতাবাজার এলাকায় কেটেছে আমার শৈশবের শুরু থেকে অনেকটা অংশ। আমাদের প্রতিবেশী এক বিহারী লোক প্রায়ই আমার আম্মাকে বলতেন, “ইমরান তো উস্কি আব্বাকো নেহি পেহেচানেগা”। আম্মা মুচকি হাসতেন। অনেক সময়ই আব্বুর ঘরে ফেরার আওয়াজ পেলে আমি জেগে উঠতাম। যে কোন বিশেষ দিন, যেমন ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৬ ডিসেম্বর, শবে বরাত, ইত্যাদি দিনগুলোতে আব্বা পুরান ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি নিয়ে আসতেন। আদর এবং শাসনের দ্বৈত রুপ দেখেছি আমার বাবার মধ্যে।

আমার বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর রেগুলার ফাইটার হিসেবে। এক অপারেশনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং আহত অবস্থায় অনেক লম্বা সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সবাই ধরে নিয়েছিল যে আব্বা আর জীবিত ফিরবেন না। কিন্তু তিনি ফিরেছিলেন বিজয়ীর বেশে। আমার দাদার কাছে শুনেছি, আব্বা খুব রাগী ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। কোথাও কোন অন্যায় উনি সহ্য করতেন না। মৃত্যুকে কখনও ভয় করতেন না। সদরঘাটের অনেক অস্রধারী সন্ত্রাসীকে উনি খালি হাতে পিটিয়েছেন। জীবনে উনি কোন নেশা করেননি। হারাম উপায়ে উপার্জন থেকে সর্বদা দূরে থেকেছেন। ছোটবেলা থেকেই প্রচুর পরিশ্রম করেছেন পরিবারের জন্য। ছোট ভাইদের মানুষ করেছেন, নিজের পায়ে দাড়াতে শিখিয়েছেন। উনার সততা এবং পরিশ্রমের জন্য উনি এখনও আমাদের গ্রামের বিভিন্ন জেনারেশনের কাছে জনপ্রিয়। 

আমাদের দুই ভাইবোনকে আব্বা সেই সব কিছুই না চাইতে দেবার চেষ্টা করেছেন, যেটা উনি ছোটবেলায় পাননি। আব্বা মেধাবী ছাত্র ছিলেন, কিন্তু পারিবারিক কিছু কারনে গ্রাজুয়েশন করতে পারেননি। কিন্তু আমাদেরকে উনি লেখাপড়ার কোন বিষয়ে কখনও কমতি রাখেননি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ধন সম্পদ মানুষকে বড় করে না, মানুষ তার মনের সমান বড়। সবসময় সবাইকে সমান দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। মানুষের যে কোন সমস্যায় এগিয়ে যাওয়াতে আব্বা সবসময় উৎসাহ দিতেন এবং এখনও দেন। মাঝে মাঝে আমি মনে মনে ভাবি যে, আমি কি আব্বার মত হতে পারব? পরমুহুর্তে চিন্তা আসে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি পারব না, এটা হতেই পারে না।

আপনি আমাদের গর্ব আব্বা। কোন বিশেষ দিনের জন্য আপনার প্রতি শ্রদ্ধা বরাদ্দ থাকবে না। আপনি আমাদের মনের মণিকোঠায় থাকবেন সর্বক্ষণ। সামনাসামনি হয়ত কখনও বলা হয়নি। কিন্তু পরোক্ষ ভাবে বলছি, “আব্বা, আপনাকে আমি খুব ভালবাসি।“

Saturday, 2 June 2012

কোন এক বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা


বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা” কথাটি শুনলেই মনের ভেতর কেমন একটা ভেজা ভেজা অনুভূতি হয়। স্কুল কলেজে প্রায়ই দেখতাম বর্ষণমুখর সন্ধ্যা রচনা মুখস্থ করতে বলা হয়। আচ্ছা, আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা কি মুখস্ত করে লেখার মত কোন বিষয়?


সাধারনত বৈশাখের শুরুতে এবং আষাঢ়, শ্রাবন দুই মাসে প্রায়শই বর্ষণমুখর সন্ধ্যার দেখা মিলে। অন্যান্য সময় যে বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা পাওয়া যায় না, তা নয়। তবে একটু কম পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে বৃষ্টি খুব ভালো লাগে। কবি হয়ে যেতে চায় মন। আর মাঝে মাঝে বর্ষণমুখর সন্ধ্যা সামনে পড়লে মনে হয়, “যা শালা!! বৃষ্টিটা এসেই গেল...........!!!”

এক গ্রীষ্মের ছুটিতে কাউকে না জানিয়ে তল্পিতল্পা গুঁটিয়ে দুপুরের একটু পরে রওয়ানা দিলাম বাড়ির দিকে। আমার বাড়িটা কোন শহুরে এলাকায় নয়। একেবারেই অজ পাড়া গাঁ। এই আধুনিক ডিজিটাল যুগেও আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। বাসস্টপে নেমে রিক্সা নিয়ে গ্রামের সীমানায় যখন পৌছুলাম তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। প্রচণ্ড ভ্যাঁপসা গরম চারপাশে। গ্রীষ্মে যা হয়, ঐ যে, কাল বৈশাখীর কথা বলছি!! সেটা শুরু হবে হবে করে। আকাশ থমথমে, কোথা থেকে যেন এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগল। বুঝে উঠার আগেই প্রচণ্ড বেগে বাতাস ছেড়ে দিল। ধূলায় চোখে কিছু দেখছি না। সিদ্ধান্ত নিলাম রাস্তা ছেড়ে জমির আইল ধরে যাব। যেই ভাবা, সেই কাজ, জুতো প্যান্ট সহই নেমে পড়লাম জমির আইলে। আস্তে আস্তে খুব সাবধানে হেঁটে যাচ্ছি যেন পিছলে না পড়ি। আর মনে মনে ভাবছি, এবার বৃষ্টি না এলেই হয়। বলা নেই কওয়া নেই। ঝুপ করেই বৃষ্টি নামল। অজান্তেই মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো, যা শালা, বৃষ্টিটা এসেই গেল। 

শত সাবধানতা সত্ত্বেও বৃষ্টি শুরু হওয়ার প্রথম মিনিটেই প্রথম আছাড় খেলাম, উঠতে গিয়ে আবার। এর পর আবার। প্রথম ধাক্কা কাঁটিয়ে ১০ কদম সামনে যাওয়ার পর পা হড়কে একেবারে কর্দমাক্ত জমিতে। সারা শরীরের কোথাও কাঁদা লাগা বাকি রইল না। ঝড়ে, জলে, কাঁদায় মাখামাখি হয়ে যখন বাড়ি পৌঁছুলাম, দরজা খুলে মা তখন প্রথমে আমাকে চিনতে পারেননি। ১০ সেকেন্ড পর যখন চিনলেন, তখন উনার চিৎকার দেখে কে। গোসল করে খাওয়া দাওয়া করে মাথায় ভালো করে খাঁটি সরিষার তেল মেখে, এক কাপ চা নিয়ে যখন আমার রুমের জানালার পাশে বসলাম.... একটু দৃশ্যটি কল্পনা করুন, টিনের চালে কখনও ঝমঝম কখনও টাপুর টাপুর করে বৃষ্টির ঝরে পড়া। আপনি জানালার পাশে গরম চা এর কাপ হাতে এক নিবিষ্ট মনে দেখছেন রাতের ভিজে যাওয়া। সামনে কেরোসিন বাতির টিমটিমে আলো হালকা শীত শীত আমেজ। একটা পাতলা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আয়েশ করে হেলান দিয়ে চা খাচ্ছেন, আর সামনে কাগজ কলম। বলুন, এমন পরিবেশে কি দু’লাইন কবিতা বের হয়ে আসে না......... 
আমি জানি, আসে......... 

আমার এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা রচনা এসেছিল। সবাই দেখি মুখস্ত লেখে। আমি ঠিক এমন কিছুই লিখেছিলাম। একটু পরিমার্জন হয়েছে। তবে “যা শালা! বৃষ্টিটা এসেই গেল” এই লাইনটা লিখেছিলাম........ 

Friday, 18 May 2012

ভাল থাকিস বন্ধু.....





হালিম,


আমি জানি এই চিঠি আমি কখনও পোস্ট করব না, তুই ও কোনদিন এই চিঠি পড়বি না। তবুও আজ কেন যেন তোকে চিঠি লিখতে বসে গেলাম। জানিনা কেন বসতেই হল.... 


তুই কি জানিস, আজ সেই ২০ই জুলাই? আজ থেকে ১০ বছর আগে এই রকম এক দিনের শেষে বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তুই চলে গিয়েছিলি। গিয়েছিলি চলে দূর অজানার পথে, আকাশের ঠিকানায়। যেখানে, যে পথে কেউ চলে গেলে আর কখনও ফিরে আসে না, আসতে পারে না। সেই না ফেরার দেশে বসে তুই কি দেখতে পাচ্ছিস আমাকে, এই পৃথিবীকে? এই নিষ্ঠুর, স্বার্থপর, কমার্শিয়াল পৃথিবীর কতজন তোকে মনে রেখেছে জানি না। শুধু জানি, মা, বাবার মনে আছে সন্তান হারানোর কষ্ট। তাদের চোখে আজো ঝরে কান্না শুধু তোকে মনে করে। জানি, সেই কান্না হার মানাবে পাহাড়ের কান্নাকে, আকাশের কান্না কেও।


অনেকদিন পর পুরনো ডাইরি ঘাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ল তোর চলে যাওয়া এই দিনটি। মনে পড়ল তুই ছিলি আমাদেরই মাঝে, আমাদেরই একজন হয়ে। আমাদের মতই ছিলি উচ্ছল। গান লিখতি, কবিতা লিখতি, ছন্দ লিখতি। তোর মনে আছে, সেদিন তোর কবিতা শুনে সবার সে কি হাসাহাসি। তুই অভিমানে গাল ফুলিয়েছিলি, বলেছিলি, দেখিস তোদের ছেড়ে একদিন চলে যাব। বড্ড অভিমানী ছিলি তুই। তোর সেদিনের কথাটা আজো আমার কানে ভাসে। সেদিন বুঝতে পারিনি এতটাই আচমকা তুই আমাদের ছেড়ে চলে যাবি। কোনদিন বুঝতে পারিনি তোর মনে এই পৃথিবী একে দিয়েছে অনেক বেশি অভিমান। কেন, এমন করলি তুই? যাকে ভালবেসে, তুই চলে গেলি, তুই তো কোনদিন যানতেও পারলি না যে, সে সুখে আছে কি না..... 


যখন ফাঁসের দড়ি তোর গলায় জড়াচ্ছিলি, তখন কি তোর বাবা মায়ের হাসিমাখা মুখ তোর একবারও মনে পড়েনি, তোর বন্ধু দের ভালবাসা কি তোর কাছে অনেক কম পরে গিয়েছিল, তোর গান, কবিতা, ছন্দ কি তোকে আটকানোর চেষ্টা করেনি। তুই কি জানিস, তোর চলে যাওয়ার কথা শুনে আমরা যখন তোর বাসায় গেলাম তোকে শেষ দেখা দেখতে, সেদিন শিমু কি পরিমান কেঁদেছিল!! আমি তোর মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি তোকে শেষ দেখার। তোর সাথের এই বন্ধুরা অনেকেই আজকে জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছে। হয়ত তোর এতদিনে বিয়ে হত। সন্তানের বাবা ডাক শুনতি। আমার মেয়ে যখন আমাকে বাবা বলে ডাকে, তখন আমার যেমন লাগে, তোর ও কি তেমন লাগত? 


যখন খুব প্রিয় কেউ দূরে চলে যায়, তখন কেমন লাগে, সেটা তোকে আর বোঝানো সম্ভব না। তবে তোর কাছে আমার প্রশ্ন থাকবে আজীবন, তুই আসলে কি সুখে অকালে চলে গেলি? আমাদেরকেই বা কি সুখ দিলি? আজ তুই থাকলে হয়ত অভিমান করতি। কিন্তু বিশ্বাস কর বন্ধু স্মরণের ভাষা, চলে যাওয়ার ভাষা, হারানোর ভাষা ঠিক হয়ত এমনই হয়। আজ মন ভরে শুধু এতটুকু প্রার্থনা, যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস।


বন্ধু
আলইমরান


বিঃদ্রঃ গত ২০/৭/০২ সন্ধ্যা ৬ টায় আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু “হালিম” আত্মহত্যা করে। তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা।

Monday, 27 June 2011

আমার গানের খাতার স্মৃতি থেকে............

আইয়ুব বাচ্চু
প্রয়াত আযম খান


আমি....... ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড গান শুনতে পছন্দ করি। তো তখন মাঝে মাঝেই গুনগুন করে গান গাইতাম। প্রথম ভালো লাগা গান গুলোর মধ্যে ছিল “হাওয়া হাওয়া” এবং “মুকাবেলা” টাইপের হিন্দি গান। একটু বুঝার পর শুনতাম পপগুরু আযমখান এর “ওরে সালেকা ওরে মালেকা”, “রেল লাইন এর বস্তিতে”, “ আলাল আর দুলাল” ইত্যাদি। আরও একটু বড় হয়ে শুনতাম আশ্রাফ বাবু এবং চারুর র‍্যাপ গান। আমি যখন যে ধরনের গান শুনতাম তখন আমার বন্ধু মহলে ওই গান গাওয়ার জন্য আমি বিখ্যাত ছিলাম। আর একটু বড় হয়ে শুনতাম আর্ক, জেমস, আয়ুব বাচ্চু। আয়ুব বাচ্চুর চেয়ে আর্ক এর হাসান এবং জেমস খুব প্রিয় ছিল। যখন ৭ম/৮ম শ্রেণীতে পড়ি তখন পরিচয় হয় ভারতীয় জীবনমুখী বাংলা গানের অন্যতম শিল্পী নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত এবং সুমন চট্টপাধ্যায় এর সঙ্গে। তখন ওনাদের গান ছাড়া কিছু বুঝতাম না। এখনও নচিকেতার গান গুনগুন করে গাই। 

একতারা হাতে বাউল
S.S.C এর সময় পরিচয় হয় বাউল গান বা দেশি গান এর সাথে। তখন বারী সিদ্দিকির “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়” এবং “সোয়া চান পাখী” গান গুলো চমৎকার ভাবে গাইতে পারতাম। তখন একটা সময় চলছিলো যখন এধরনের গান খুব চলত। এরপর যে গান গুলো চলত সেগুলো হোল “কৃষ্ণপক্ষ কালপক্ষ”, “আমার একটা নদী ছিল”, “মাক্ষি গিরা গরম তেল মে”, “ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা”, “বাজারে মন এই দেহ মাদল”, এবং জেমস এর “পাগলা হাওয়ার তোড়ে” ইত্যাদি।

B-)B-)B-) কলেজে পড়ার সময় আমার সাথে পরিচয় হয় “হীরা” নামক একটি ছেলের সাথে। খুব মিশুক ও চটপটে স্বভাবের কারনে অর সাথে আমার বন্ধুত্ব হতে দেরি হয় না। আমাদের বন্ধুত্ব হবার আরও একটা বড় কারন ছিলো, ও ভালো গান গাইতে পারত। বন্ধু মহলে মাইক্রো কনসার্ট করার ক্ষেত্রে একজন কো-পারফরমার পেলাম। এরপর থেকেই আমরা দুজন। খুব দ্রুতই পুরো কলেজে আমাদের কথা জেনে গেলো। কলেজের ২য় বর্ষে থাকাকালীন একটা নবিন বরন অনুষ্ঠানেও আমরা গান গেয়েছিলাম।


:):):) এমনিভাবে চলতে চলতে একদিন আমরা দুজনেই খেয়াল করলাম দুষ্টামির ছলে আমরা অনেক কথা সুরে সুরে বলছি। সেখান থেকে গান লেখার আইডিয়া এলো। আমি অল্পবিস্তর কবিতা লিখতাম। সিদ্ধান্ত হোল আমার একটা কবিতা দিয়েই গান এর শুরু করতে হবে। এক ছুটির দিনে আমি, হীরা আর ববি (..;)...... ও বলতে ভুলে গেছি, ববি আমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ড এবং বর্তমান স্ত্রী, আমরা তিনজনই বন্ধু ছিলাম।) আমার বাসায় বসে একটা টেপ রেকর্ডার, কাঠের টেবিল (বিট এবং রিদম দেয়ার জন্য), অর্ধ ভর্তি ষ্টীলের মগ এবং চামচ (পানির ঢেউ এর মতো আওয়াজ করার জন্য আমার আইডিয়া), একটা বাশের বাকা কঞ্চি (পায়ে বেজ দেয়ার জন্য), ইত্যাদি যন্ত্রপাতি বা মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে রেকর্ড করতে বসলাম আমাদের প্রথম গান এর ডেমো। গানটি ছিল “যতদিন রইবে ওই আকাশ, যতদিন রইবে ওই বাতাস, যতদিন রইবে সুর আমার, ততদিন রইব আমি তোমার” আমাদের প্রথম গান তাই এর প্রতি ভালবাসাটা ও অনেক বেশী ছিল। যদিও এখনও এই গানটা অন-এয়ারে যায়নি কিন্তু আমার বন্ধু মহলে বেশ জনপ্রিয়। এর পর আমি আর হীরা আমার বাবার বকা উপেক্ষা করে কত রাত জেগে জেগে গানের সুর করেছি তার কোন হিসেব নেই। বেশির ভাগ রাতেই প্রথম ভাগে আমি জাগতাম এবং ওকে উৎসাহ দিয়ে গান ধরিয়ে দিতাম এবং এরপরই আমি ঘুমিয়ে পরতাম। এই নিয়ে ওর বিরক্তির অন্ত ছিল না। পরবর্তীতে আমাদের এই কার্যকলাপে মাত্র দু দিনের জন্য যুক্ত হয়েছিল একটা খেলনা কীবোর্ড। আমরা তখন তার পরিপূর্ণ ব্যবহার করেছিলাম। সেই ঘটনা গুলো মনে পড়লে খুব ভালো লাগে এবং খুব হাসি পায়।

হীরা, BAFA(bulbul academy of fine arts) থেকে নজরুল সঙ্গীত এর উপর ৪ বছরের কোর্স সম্পন্ন করে বর্তমানে মিউজিক ডিরেক্টর চঞ্চল মাহমুদ ভাই এর কাছে মিউজিক ডিরেকটিং এর উপর তালিম নিচ্ছে।

আমাদের দুজনের লেখা ও সুর করা প্রায় ৪০টির ও বেশী গান আছে। হয়তো কখনও কোন একসময় অন-এয়ারে শুনতে পাবেন। এখন যদিও সেই কলেজ জীবনের মতো গানের চর্চাটা নেই। তারপরও বন্ধুরা একসাথে হলে গান আর আড্ডা খারাপ চলে না।
:):);):P;):P;):)