Showing posts with label মনখেয়াল. Show all posts
Showing posts with label মনখেয়াল. Show all posts
Tuesday, 13 October 2015
Friday, 26 April 2013
আমার নতুন বন্ধু: 'ভুচুকুলু ও চার রূপসী'
মঞ্জুশ্রী রায়চৌধুরী
অভিজ্ঞতা মানেই পোকায় কাটা গন্ধদিনের ভান্ডার (নিজের অনুভবে), জ্ঞানের আড়ম্বর মানেই পাশ থেকে প্রজাপতিদের উড়ে যাওয়া (আমার আপন বোধে) অথচ কচিকাঁচাগুলো একদম আনপ্রেডিক্টেবল রঙমশাল... কখন ফাটবে বা রঙ ছড়াবে জানা নেই। ভুলভ্রান্তির মধ্যে দিয়ে যাওয়া ওরা একথোকা সারল্য। আমি সরলতায় যেতে চাই। ওরা হিসেবহীনের মাঠ, ছুঁতে চায় দিগন্ত- আমিও হাত ধরে সেই অবধি ছুটতে চাই। ভুলে যেতে চাই যুক্তি-বুদ্ধি-কার্যকারণ। মনে-মনে আমি স্কুল জীবনে ছিলামই... এখন বাস্তবিক বন্ধু জুটিয়ে ক্লাশে ঢুকছি।
ভুচুকুলু ও চার রূপসী
প্রাণ পাচ্ছি আবার... বাঁচছি নতুন করে জীবনের অন্য মানে
খুঁজে নিয়ে অন্য নতুন বোধে। এই ‘ভুচুকুলু ও চার রূপসী’কে আমার বন্ধু বলে
যেই মেনে নিয়েছি, সেই বদলে গেছে অন্তরমহল। যেন পাহাড়ি ঝোরায় নাইতে নেমেছি। মাড়িয়ে আসা সময়ের যত
গ্লানি আর ঘষটানো যাপনের ক্লান্ত দিন-মন-বাঁচাকে রিচার্জ করে চলেছি- তারপর থেকেই। এরা কুঁড়ির থেকে সবে
মুক্ত হাওয়ায় পাপড়ি মেলছে, নিষ্পাপ মন থেকে উড়ছে চন্দনগন্ধ... আমি কেন না সামিল
হই তা’তে? আফটার অল আমিও তো ফুল, আমিও তো সুবাতাস... খালি ‘কাল’এর ময়লা মন থেকে মুছেটুছে
ফেলে আমায় জাগতে হবে চন্দনবনে। সে চেষ্টাতেই ছিলাম, হঠাত্ পেয়ে গেলাম এদের। ব্যস, আর কে পায় আমায়, ভোরের
ফুলগুলোকেই বানিয়ে নিয়েছি জিয়নকাঠি, আমার রাত্রিদিনের
অপেক্ষা।
অভিজ্ঞতা মানেই পোকায় কাটা গন্ধদিনের ভান্ডার (নিজের অনুভবে), জ্ঞানের আড়ম্বর মানেই পাশ থেকে প্রজাপতিদের উড়ে যাওয়া (আমার আপন বোধে) অথচ কচিকাঁচাগুলো একদম আনপ্রেডিক্টেবল রঙমশাল... কখন ফাটবে বা রঙ ছড়াবে জানা নেই। ভুলভ্রান্তির মধ্যে দিয়ে যাওয়া ওরা একথোকা সারল্য। আমি সরলতায় যেতে চাই। ওরা হিসেবহীনের মাঠ, ছুঁতে চায় দিগন্ত- আমিও হাত ধরে সেই অবধি ছুটতে চাই। ভুলে যেতে চাই যুক্তি-বুদ্ধি-কার্যকারণ। মনে-মনে আমি স্কুল জীবনে ছিলামই... এখন বাস্তবিক বন্ধু জুটিয়ে ক্লাশে ঢুকছি।
কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল- কি চাই যেন আমরা?
কার কাছে চাই? চাই আসলে অস্তিত্ত্বের স্বীকৃতি- স্বত্ত্বার প্রতি অন্যের মনোযোগ। কিন্তু পাই কি?
ঠোক্কর খেতে-খেতে যদি নির্লিপ্তির মধ্যে ঢুকে
পড়ি কখনো, তখন হঠাত্ দেখি হাত ফাঁকা... শূন্যতর বোধে পৌঁছৈ গেছি অখেয়ালে। সে’সব ঝেড়েঝুড়ে ফের যখন ভেসে উঠতে চাই, একাকীত্বের ব্যথা মুছে ‘পূর্ণ আছি’–র
মায়ায় যেতে চাই- তখনই বন্ধু খুঁজি, ফেসবুকে আসি, উগড়ে দিই কিছু তাত্ক্ষণিক
হিসেব-নিকেশ, এলো-কথার পাঁচালী। যাঁরা ছবি টাঙিয়ে, কেজো কথার ফুলঝুরি উড়িয়ে
‘সমুখে শান্তি পারাবার’ দেখতে পান, তাঁরা তবু যেমন-তেমন। অবস্থা করুণ তাঁদেরই, যাঁরা কবিতা লেখেন, আঁকেন, দর্শনতত্ত্বে আনন্দ পান। নিজেকে গল্পকার, কবি
বা দার্শনিক ভাবা সেই তাঁরা আদ্যান্ত সাজানো একটা রূপকথার সঙ্গে বসত করেন- অজান্তেই। সৃজনধর্মী কাজ পোস্ট
হওয়া মাত্রই যখন অমনোযোগীতার প্রতিযোগীতায় নাম লিখিয়ে ক্রমাগত নীচে নামে... নেমেই
চলে, তখন কবির স্বপ্ন ফুরোয়, বাকীদের বোকা ভেবে করুণা করেন (আড়ালে নিজেকেই!)। আরেকদল
আছেন, দুর্দান্ত... যাঁরা Promotion-এর কারণে Socialite করেন। পত্রিকায় লেখা বেরলে, সদনে প্রোগ্রাম হলে, এ্যাকাডেমীতে নাটক,
চ্যানেলে ইন্টারভিউ...
কিন্তু খুশী একসময় এখানেও ফুরোয়, ক্লান্তি আসে। ‘অকারণের
আনন্দ’ বলে একটা আনন্দ আছে, যা কার্যকারণ ভুলে শুধু তৃপ্তিবোধে নেয়, যা দেয় এই ‘ভুচুকুলু ও চার রূপসী’-র মত ছুটকোগুলো। এই রোদ্দুর, এই ঘাসফুল আমায় শান্তি
দিয়েছে, জানি আরো দেবে... যদি ভুলে যেতে পারি আমারই কাছে বানিয়ে রাখা আমার ফানুস অবস্থান।
Labels:
মনখেয়াল
Friday, 23 November 2012
Monday, 1 October 2012
'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'
প্রাতঃভ্রমণের
সঙ্গী শিখাদি এন্ড মি, প্রায় প্রত্যহ বোটানিকাল গার্ডেন একনম্বর লঞ্চঘাটের
বাঁধানো সোপানে বসিয়া চা পান করি। শিখাদি মাছের নৌকা দেখিলেই উচাটন হয়,
প্রায় রোজই। সুবর্ণরেখাকে মনে করিয়া, সেই নদীর মৎসকূলকে স্মরণ করিয়া দুঃখী
হয়। আজ এক পাইকার ঘাটে দাড়াইয়া অদূরে নোঙর
ফেলিয়া দাঁড়াইয়া থাকা একখানি ছোট্ট জেলে নৌকার সমুখে দাঁড়ানো
শাট-পেন্টুলুন পরিহিত এক সজ্জনের সহিত মোবাইল করিতেছিলেন। শিখাদি সেই
মোবাইল-কথার মর্ম উদ্ধার করিল, অই নৌকায় বড় বড় গলদা আছে। এবং তাহা গঙ্গার
জলের চাইতেও সস্তায় নৌকামালিক বিক্রি করিতেছে। শিখাদি এবং মৎস্য পাইকার
খানিক বার্তালাপ করিল, পাইকার ভরসা দিল, এখনি নৌকা তীরে আসিবে এবং পাইকার
আমাদিগকে গলদা ক্রয় করিয়া দিবে, ইহাতে কোন গলদ নাই। আমি এন্ড শিখাদি
দুইজনাই প্রাতঃভ্রমণের ছোট্ট ছোট্ট বটুয়াগুলি খুলিয়ে পয়সা গুনিয়া লইলাম।
পাইকার যা মূল্য শুনাইয়াছে তাহাতে শিখাদি এক সের পরিমান এবং আমি আধাসের
পরিমান ক্রয় করিয়াই ফেলিব! চায়ের মূল্য আগামীকল্য মিটাইলেই হইবে এমন ভরসা
চা-দিদি দিলেন।ইত্যবসরে নৌকার সমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সজ্জন ঘাটে আসিলেন এবং আমাদিগকে হস্ত-পদ-শুঁড় সঞ্চালনকারী গলদার দর্শন করাইয়া ঘাটে অবস্থানকারী পাইকার মহাশয়ের কর্ণে কোন এক মন্ত্র দিলেন এবং দুইজনাই একখানি দ্বিচক্রযানে চড়িয়া নিমেষেই অন্তর্হিত হইলেন।
শিখাদি প্রবল ব্যস্ত হইয়া পাইকার মহাশয়ের খোঁজ করিতে লাগিল কিন্তু তাঁহার টিকির দর্শনও আর পাওয়া গেল না। এতক্ষণ ধরিয়া পাইকার মহাশয় আমাদিগকে যে আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল নির্দ্বিধায় সেই বাণীতে বিশ্বাস করিয়া শিখাদি তাহার পাদুকা এবং আমি আমার গাম্বুটজোড়া খুলিয়া তীরে রাখিয়া প্রায় হাঁটুসমপরিমান কর্দমায় পদযুগল রাখিলাম। মনে আশা অন্য কোন সজ্জন পৌঁছাইয়া ঐ গলদা ঝোলাগত করিবার পূর্বেই আমরা ক্রয় করিয়া ফেলিব। তীর হইতে বিহারি চা-দিদিমণি চেঁচাইতে লাগিলেন, ও দিদি, পড়ে গেলে যে হাত-পা ভাঙ্গিয়া যাইবে যে গো! সেদিকে কর্নপাতমাত্র না করিয়া আমরা নৌকার সন্নিকটে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম এবং এক সময় পৌঁছাইয়াও গেলাম! এমন সময় বেশ ছোট্টমতন একখানা হড়কা বান আসিল এবং জল হইতে অল্প দূরত্বে অবস্থানকারী আমরা এই বান দেখিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিলাম। শিখাদি প্রায় দিনই আসসোস করিয়া থাকে, একদিনের তরেও জোয়ার দেখিতে পায় না বলিয়া। আজ জোয়ার না হউক, বান দেখিয়া সে যারপরনাই প্রীত হই্ল।
নৌকা হইতে মৎসশিকারী আমাদিগকে যে চিংড়ির দর্শন করাইল, তাহাকে গলদা বলিবার মত গলদ কর্ম এমনকি শিখাদিও করিয়া উঠিতে পারিল না, আকুলকন্ঠে অস্ফুটে কহিতে পারিল শুধু, 'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'
এই প্রকার সেই প্রকার কোন প্রকারে আমরা কাদা ঠেলিয়া একটিও আছাড় না খাইয়া ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম এবং গঙ্গাস্নানে নিমগ্ন পিতা-পুত্রের যৎপ্রোনাস্তি বিরক্তির উদ্রেক করিলাম বাঁধানো সোপানে পদযুগল হইতে কাদা ধুইবার অভিলাষ প্রকাশ করায়। অই স্থানে তাহাদের দ্রব্যাদি রহিয়াছে, জল-কাদায় যাহা নোংরা হইবার প্রব সম্ভাবনা! চা দিদির আগাইয়া দেওয়া বালতির জলে যতটুকু সম্ভব কাদা পরিস্কার হইল। সহৃদয় বৃদ্ধের আগাইয়া দেওয়া গামছাখানিতে পা মুছিয়া গাম্বুট পরিয়া যৎপরোনাস্তি আমোদ প্রাপ্তি করিয়া অদ্যকার প্রাতঃভ্রমণ সম্পন্ন হইল!
Labels:
মনখেয়াল
Monday, 6 August 2012
খামখেয়ালে দেওয়াল লিখন
গুলাম আলী গাইছেন। আমি পড়ছিলাম অদিতি ফাল্গুণীর হেরুকের বীণা। ইন্দ্রাণীর
উইদাউট আ প্রিফেস। মাথার ভিতর শব্দের কুচকাওয়াজ। বাংলাদেশ বাংলাদেশ।
মোচ্ছব। মোচ্ছব। আমি সেই মোচ্ছবে শামিল নই। কোনোভাবেই নই। অসমাপ্ত লেখার
ফোল্ডার ভর্তি লেখাগুলো সব আধখ্যাচড়া। দুই বা তিন প্যারাগ্রাফ। এর বেশি আর
এগোয় না। কিছুতেই এগোয় না।
নিশুথি রাত। ম্যালা রাত। কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে পড়েছে কখন যেন। বহুকাল বাদে এমন রাত। মাথা ভার নেই, ওষুধের ঘোর নেই। ঘুম নেই। এমনকি নিত্যসঙ্গী ক্লান্তিও নেই। সোঁ সোঁ শব্দে জোর কদমে পাখা ঘুরছে, ঘুরেই চলেছে অবিরত, অনন্ত। সুইচ না টেপা অবধি থামবে না, থামবেই না। রাত নিঝুম। নিঃঝুম। বহুদিন পর। গুলাম আলি গেয়েই চলেছেন, আপনি ধুন্মে রেহতা হুঁ/ ম্যায় ভি তেরে য্যায়সা হুঁ..কার মত তিনি?
রাম আর কোক কবে থেকে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে জো-তে। সেই জো। প্রেমে পড়ে এদেশে থেকে যেতে চেয়েছিল। অথবা প্রেমিককে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সঙ্গে, নিজভূমে। প্রেমিকের ঘর-সংসার চুলোয় যাক। সে তো ভালবাসে। সে ভালবেসেছিল। ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে সব, পূরণ করবে সমস্ত খামতি। যা কিছু পেছনে পড়ে থাকবে, সব, সমস্ত সে ভরিয়ে দেবে- এমনটাই ভেবেছিল সে.. ভালবাসায় নাকি কোনো দোষ নেই। যদি দোষই থাকত তবে থুড়ি না রাধা-কৃষ্ণ গাঁথা লোকমুখে ফিরত! কোনো দোষ নেই।! জো এমনটাই বিশ্বাস করত, করতে চেয়েছিল।
রাত নিঝুম। নিঃঝুম। ঘুমন্ত। কাল কখন যেন 'আজ' হয়ে গেছে। 'আজ' আবার হয়ে যাবে কাল। কাল কে দেখেছে! আমি তাই কাল-কে নিয়ে ভাবিত নই। সমস্ত আজই কেমন করে যেন কাল হয়ে যায়। বা কাল হয়ে যায় আজ। এই যেমন আজ হয়েছে। খানিক আগে। না, বেশ আগে। আজ-টাই শুধু গতকাল হয়ে যায়, বাদবাকি সব আজ। আগামী বলে কিছু নেই। । নজরুল বলে গেছেন- প্রিয় এমনও রাত.. নজরুল থাকুন। বিদ্রোহী হয়ে। চিরকাল থাকুন। চির উন্নত শির নিয়ে থাকুন। কুচকাওয়াজে থাকুন। বদ্ধ, আবদ্ধ ঘরে না থাকতে চাওয়া নজরুল। বিশ্ব দেখতে চাওয়া নজরুল। ঘুমিয়ে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। পাশেই মধুদার ক্যান্টিন।
সেদিন, কল্লোলদা,কল্লোল দাশগুপ্ত'র গান ছিল ছবির হাটে। ক্ললোলদা একক। ছবির হাট থই থই। সরু লাল পাড় সাদা শাড়ি নাসরীন। গম্ভীর মুখে কৃষ্ণাদি। অপেক্ষায় কাঁকন, কখন তুমি গাইবে, হেই ক্ষ্যাপা, মানুষ খুজো না! ব্যস্ত সমস্ত সাগর। আমি চুপচাপ এককোণে। সবে জানতে পারলাম, ছাব্বিশ বা সাতাশের আগে তিতাস কোনো নদীর নাম নয়- ছাপাখানার বিজলীবাতির আলো ছাড়িয়ে বাইরের আলো দেখতে পারছে না, পারবে না। রেশনের দোকানে কেরোসিন বা চিনির লাইনের চাইতেও বড় লাইন বই-দের। আমার মন লাগে না। কল্লোলদা, আমার মন লাগে না তোমার গানে। ক্ষমা কোরো। তুমি করবেই আমি জানি। তুমিই তো বলেছিলে, গুরু পাওয়া যায় যত্র তত্র, শিষ্য মেলা ভার। আমি ফুটপাথে। ছবির হাটের বাইরে, রাস্তায়। ওয়াসিফ এলো। খানিক বসে থাকে চুপচা্প পাশে। বলে, যাবেন? নজরলের সমাধীতে? আমি কোনো কথা বলি না। ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, মধুদার ক্যান্টিন। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে ছাপাখানায়, অনেক, অনেক বইয়ের লাইনে, সব, সমস্ত বইয়ের পেছনে লাইনে বসে থাকা আমার তিতাসে। বিস্বাদ ঠেকে চা। শাপলুরা বসে গজল্লা করে বটতলায়, বলে, শ্যাজা, আসো, গজল্লা করো। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে, রয়, ছাপাখানার অন্ধকারে, তিতাসে।
আমি এগুই, এগিয়ে যাই, নজরুলের কাছে। থাকব নাকো বন্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। আমার তিতাস গুমরে মরে, ছাপাখানার অন্ধকারে। আমার মন লাগে না। মনও লাগে না। কে যেন সেলফোন আবিষ্কার করেছিল, কেন করেছিল কে জানে! না করলে কী ক্ষতি হত!! কীই বা এমন ক্ষতি হতো!! সেই সেলফোনে ঘন্টা নেজে যায়, বেজে যায়, বেজেই যায়.. সে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে, চিন্তিত হয়ে অনর্গল ফোন বাজিয়েই চলেছে। কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি, কেন আছি!! সে জানে না, জানতেও চায় না, আমি নজরুলের সঙ্গে আছি। খানিক থাকতে দে.. এমন রাতও কী বার বার আসে..
চল্ চল চল
উর্ধ গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল চল চল, চল রে চল রে চল
থাকা হয় না বেশিক্ষণ নজরুলের সঙ্গে। ঘুমাও নজরুল,শান্তি কী অশান্তি জানি না, কিন্তু ঘুমাও তুমি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে, মধুদার ক্যান্টিনের খানিক দূরে ঘুমাও তুমি। আধো আলো আধো অন্ধকারে ঘুমাও তুমি..
আমি এগুই। এগিয়ে যাই। আমার তিতাস যে অন্ধকারে। ওয়াসিফ চুপচাপ। কোনো কথা বলে না। ভাগ্যিস বলে না। আমি কোনো সান্তনা চাই না। আমার একটা বন্দুক চাই। চাই, কিন্তু পাই না। পাব না, জানি।ভাগ্যিস পাই না, দু দিন বাদেই সেই বিডিয়ার হত্যাকাণ্ড। রাস্তায় ট্যাঙ্ক, কার্ফিউ, মুহুর্মুহু গুলি আর বুকের ভিতর হাঁপরের শব্দ। না। আমার কোনো বন্দুক চাই না। আমি বিশ্বাস করি না বন্দুকের নলই ক্ষমতার সকল উৎস। তাই চুপচাপ হন্ঠন। তাই নত মস্তক। গন্তব্য-ছবির হাট। সেখানে এতক্ষণে কাল্লোলদা হয়ত গান থামিয়েছে। কল্লোলদা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। শেষমেশ কল্লোলদাও তো মানুষ। টানা তিন ঘন্টা একা হাতে সামলেছে ছবির হাট। এখন তো ফেরার পালা। পাঠশালায়।
মেঝেতে পাতা কার্পেট, তার উপরে তোষক, আর মতিভাইয়ের দাক্ষিণ্যে পাওয়া একখানা চাদর, যেখানে দিন কতকের অস্থায়ী বাস কল্লোলদা আর কৃষ্ণাদির । রেহানা, মতিভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী। আক্ষরিক অর্থেই। পাঠশালার বাসিন্দারা রেহানার ইচ্ছের অধীন। মতিভাইও। খুলনার বাসিন্দা মতিভাই। আমি কখনও খুলনা যাইনি। আমি আর কোথায়ই বা গেছি! সে কথা থাক । কল্ললোদা। আজিজ মার্কেটের কথা বলি বরং। চাচার সিডির দোকান। কল্লোলদা সেখানে কি একটা সিডি কিনতে গেছে। সঙ্গী কৃষ্ণাদি, মাসুদ। নাকি নাসু মিঞা! ভুলে গেছি! সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটার খাপমুক্ত হয়, চাচার দোকানে গান শুরু হয়। আমি শুনিনি সেই সব গান। আমার মন, আমি অশরীরি হয়ে ছাপাখানায়, তিতাসের কাছে। চাচার সিডির দোকানে পৌঁছানোর আগে, আজিজে পা রাখতেই কানে আসে, সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে! কৃষ্ণকলি আর চন্দনাদি।
আমাদের বাড়িতে দালান যখন তিন কোঠার ছিল, মাইঝের কোঠায়, আমার পিসিমার হাতে করা একখান বান্ধানি টাঙানো ছিল, কয়েকটা সবুজ সুতোয় বোনা ঘাস, সাতা সুতোর ফুল আর লাল সুতোয় লেখা- সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে.. আমি আটকে যাই। থমকে যাই। চমকে যাই। সেই প্রথম কৃষ্ণকলি। সেই প্রথম চন্দনাদি। আমার পিসিমা আর এরা কোথায় যেন মিলে মিশে একাকার.. গীত গাওয়া পিসিমা আমার। রেডিও শুনে শুনে নজরুল গীতি গাওয়া পিসিমা আমার। পিসিমা জানে না, জানবেও না, সেই আটপৌরে শাড়ি, লুকিয়ে শোনা রেডিও, চুপি চুপি গাওয়া গান সব তার অক্ষয় হয়ে রয়ে গেছে কোথাও, আজও আছে সেই সব গান। সেই বান্ধানি আছে কিনা কে জানে। কথাগুলো এখন সুরে সুরে এখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে, সবখানে..
ছাপাখানা বদল হয়। সিডিবন্দী হয় আমার তিতাস। নির্মলেন্দু। শক্তি, আমি আর আমার কদমগাছ। সাগর হাত বাড়িয়ে দেয়। আরফান সঙ্গে থাকে। এলিফ্যান্ট রোড। কাঁটাবন। প্রেস। সূর্যের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশের আলো দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকে তিতাস। সূর্য ওঠে। আলো ফোটে, সকাল এগোয় দুপুরে। ভুত সওয়ার হয় ছাপাখানায়, তিতাস আছে, আমি নেই। আমি আবার ফুটপাথে। পরনে ঢাকাই শাড়ি, ছবির হাট, ফুটপাথ আর আমি। শেষমেশ নামহীন তিতাস হাজির হয় একুশে বইমেলায়। ধুলোয় বসে আমি, পরনে ঢাকাই শাড়ি। ভুলে যাই, মনেই পড়ে না কাউকে বলা বা ডাকার কথা। আমার বই। প্রথম বই। হুয়ত বা একমাত্র। আমার তিতাস। বড় নীরবে, নিঃশব্দে বয়ে যায় একুশে বইমেলায়। কৃষ্ণাদি অনুযোগ করে, ডাকলে না.. আমার মনেই ছিল না, কাউকে বলা যায়, ডাকা যায়, গান-বাজনা বা নিদেন একটু প্রকাশের অনুষ্ঠান! কিছুই নেই। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছুটি নেই.. আমার বন্ধুরা, আমার স্বজনেরা, আমার গুরু, কেউ নেই.. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল! আমি তো কাউকে ডাকিইনি। আসলে ডাকার কথা মাথায়ও আসেনি যে..
দিন তারিখ হিসেব করলে সেদিনের সমস্ত কিছু আজ'গতকাল হয়ে গেছে। বা গত বছর বা তারও আগের বছর। সমস্ত কিছু আজ স্মৃতি। কাল, পরশু বা তারও আগেকার স্মৃতি। আমিই শুধু স্মৃতিতে বাঁচি। সবকিছু, সবটুকু তাই আগলে বসে আছি আজও, এখনও। আমাকে ছেড়ে যায় না সেসব কিছুতেই, কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ে না..
আমি ভাবতাম বা ভাবি আমি স্মৃতিতে বাঁচি। আসলে তা নয়, আমি শুধু আজকেই বাঁচি। শুধু আজকে। আজ-কে নিয়ে.. কোনো ভূত, কোনো ভবিষ্যত কিস্সু নয়, নেই, আছে শুধু আজ আর কিছু স্মৃতি কথকতা...
০৫।০৩।২০১২
নিশুথি রাত। ম্যালা রাত। কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে পড়েছে কখন যেন। বহুকাল বাদে এমন রাত। মাথা ভার নেই, ওষুধের ঘোর নেই। ঘুম নেই। এমনকি নিত্যসঙ্গী ক্লান্তিও নেই। সোঁ সোঁ শব্দে জোর কদমে পাখা ঘুরছে, ঘুরেই চলেছে অবিরত, অনন্ত। সুইচ না টেপা অবধি থামবে না, থামবেই না। রাত নিঝুম। নিঃঝুম। বহুদিন পর। গুলাম আলি গেয়েই চলেছেন, আপনি ধুন্মে রেহতা হুঁ/ ম্যায় ভি তেরে য্যায়সা হুঁ..কার মত তিনি?
রাম আর কোক কবে থেকে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে জো-তে। সেই জো। প্রেমে পড়ে এদেশে থেকে যেতে চেয়েছিল। অথবা প্রেমিককে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সঙ্গে, নিজভূমে। প্রেমিকের ঘর-সংসার চুলোয় যাক। সে তো ভালবাসে। সে ভালবেসেছিল। ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে সব, পূরণ করবে সমস্ত খামতি। যা কিছু পেছনে পড়ে থাকবে, সব, সমস্ত সে ভরিয়ে দেবে- এমনটাই ভেবেছিল সে.. ভালবাসায় নাকি কোনো দোষ নেই। যদি দোষই থাকত তবে থুড়ি না রাধা-কৃষ্ণ গাঁথা লোকমুখে ফিরত! কোনো দোষ নেই।! জো এমনটাই বিশ্বাস করত, করতে চেয়েছিল।
রাত নিঝুম। নিঃঝুম। ঘুমন্ত। কাল কখন যেন 'আজ' হয়ে গেছে। 'আজ' আবার হয়ে যাবে কাল। কাল কে দেখেছে! আমি তাই কাল-কে নিয়ে ভাবিত নই। সমস্ত আজই কেমন করে যেন কাল হয়ে যায়। বা কাল হয়ে যায় আজ। এই যেমন আজ হয়েছে। খানিক আগে। না, বেশ আগে। আজ-টাই শুধু গতকাল হয়ে যায়, বাদবাকি সব আজ। আগামী বলে কিছু নেই। । নজরুল বলে গেছেন- প্রিয় এমনও রাত.. নজরুল থাকুন। বিদ্রোহী হয়ে। চিরকাল থাকুন। চির উন্নত শির নিয়ে থাকুন। কুচকাওয়াজে থাকুন। বদ্ধ, আবদ্ধ ঘরে না থাকতে চাওয়া নজরুল। বিশ্ব দেখতে চাওয়া নজরুল। ঘুমিয়ে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। পাশেই মধুদার ক্যান্টিন।
সেদিন, কল্লোলদা,কল্লোল দাশগুপ্ত'র গান ছিল ছবির হাটে। ক্ললোলদা একক। ছবির হাট থই থই। সরু লাল পাড় সাদা শাড়ি নাসরীন। গম্ভীর মুখে কৃষ্ণাদি। অপেক্ষায় কাঁকন, কখন তুমি গাইবে, হেই ক্ষ্যাপা, মানুষ খুজো না! ব্যস্ত সমস্ত সাগর। আমি চুপচাপ এককোণে। সবে জানতে পারলাম, ছাব্বিশ বা সাতাশের আগে তিতাস কোনো নদীর নাম নয়- ছাপাখানার বিজলীবাতির আলো ছাড়িয়ে বাইরের আলো দেখতে পারছে না, পারবে না। রেশনের দোকানে কেরোসিন বা চিনির লাইনের চাইতেও বড় লাইন বই-দের। আমার মন লাগে না। কল্লোলদা, আমার মন লাগে না তোমার গানে। ক্ষমা কোরো। তুমি করবেই আমি জানি। তুমিই তো বলেছিলে, গুরু পাওয়া যায় যত্র তত্র, শিষ্য মেলা ভার। আমি ফুটপাথে। ছবির হাটের বাইরে, রাস্তায়। ওয়াসিফ এলো। খানিক বসে থাকে চুপচা্প পাশে। বলে, যাবেন? নজরলের সমাধীতে? আমি কোনো কথা বলি না। ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, মধুদার ক্যান্টিন। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে ছাপাখানায়, অনেক, অনেক বইয়ের লাইনে, সব, সমস্ত বইয়ের পেছনে লাইনে বসে থাকা আমার তিতাসে। বিস্বাদ ঠেকে চা। শাপলুরা বসে গজল্লা করে বটতলায়, বলে, শ্যাজা, আসো, গজল্লা করো। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে, রয়, ছাপাখানার অন্ধকারে, তিতাসে।
আমি এগুই, এগিয়ে যাই, নজরুলের কাছে। থাকব নাকো বন্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। আমার তিতাস গুমরে মরে, ছাপাখানার অন্ধকারে। আমার মন লাগে না। মনও লাগে না। কে যেন সেলফোন আবিষ্কার করেছিল, কেন করেছিল কে জানে! না করলে কী ক্ষতি হত!! কীই বা এমন ক্ষতি হতো!! সেই সেলফোনে ঘন্টা নেজে যায়, বেজে যায়, বেজেই যায়.. সে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে, চিন্তিত হয়ে অনর্গল ফোন বাজিয়েই চলেছে। কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি, কেন আছি!! সে জানে না, জানতেও চায় না, আমি নজরুলের সঙ্গে আছি। খানিক থাকতে দে.. এমন রাতও কী বার বার আসে..
চল্ চল চল
উর্ধ গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল চল চল, চল রে চল রে চল
থাকা হয় না বেশিক্ষণ নজরুলের সঙ্গে। ঘুমাও নজরুল,শান্তি কী অশান্তি জানি না, কিন্তু ঘুমাও তুমি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে, মধুদার ক্যান্টিনের খানিক দূরে ঘুমাও তুমি। আধো আলো আধো অন্ধকারে ঘুমাও তুমি..
আমি এগুই। এগিয়ে যাই। আমার তিতাস যে অন্ধকারে। ওয়াসিফ চুপচাপ। কোনো কথা বলে না। ভাগ্যিস বলে না। আমি কোনো সান্তনা চাই না। আমার একটা বন্দুক চাই। চাই, কিন্তু পাই না। পাব না, জানি।ভাগ্যিস পাই না, দু দিন বাদেই সেই বিডিয়ার হত্যাকাণ্ড। রাস্তায় ট্যাঙ্ক, কার্ফিউ, মুহুর্মুহু গুলি আর বুকের ভিতর হাঁপরের শব্দ। না। আমার কোনো বন্দুক চাই না। আমি বিশ্বাস করি না বন্দুকের নলই ক্ষমতার সকল উৎস। তাই চুপচাপ হন্ঠন। তাই নত মস্তক। গন্তব্য-ছবির হাট। সেখানে এতক্ষণে কাল্লোলদা হয়ত গান থামিয়েছে। কল্লোলদা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। শেষমেশ কল্লোলদাও তো মানুষ। টানা তিন ঘন্টা একা হাতে সামলেছে ছবির হাট। এখন তো ফেরার পালা। পাঠশালায়।
মেঝেতে পাতা কার্পেট, তার উপরে তোষক, আর মতিভাইয়ের দাক্ষিণ্যে পাওয়া একখানা চাদর, যেখানে দিন কতকের অস্থায়ী বাস কল্লোলদা আর কৃষ্ণাদির । রেহানা, মতিভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী। আক্ষরিক অর্থেই। পাঠশালার বাসিন্দারা রেহানার ইচ্ছের অধীন। মতিভাইও। খুলনার বাসিন্দা মতিভাই। আমি কখনও খুলনা যাইনি। আমি আর কোথায়ই বা গেছি! সে কথা থাক । কল্ললোদা। আজিজ মার্কেটের কথা বলি বরং। চাচার সিডির দোকান। কল্লোলদা সেখানে কি একটা সিডি কিনতে গেছে। সঙ্গী কৃষ্ণাদি, মাসুদ। নাকি নাসু মিঞা! ভুলে গেছি! সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটার খাপমুক্ত হয়, চাচার দোকানে গান শুরু হয়। আমি শুনিনি সেই সব গান। আমার মন, আমি অশরীরি হয়ে ছাপাখানায়, তিতাসের কাছে। চাচার সিডির দোকানে পৌঁছানোর আগে, আজিজে পা রাখতেই কানে আসে, সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে! কৃষ্ণকলি আর চন্দনাদি।
আমাদের বাড়িতে দালান যখন তিন কোঠার ছিল, মাইঝের কোঠায়, আমার পিসিমার হাতে করা একখান বান্ধানি টাঙানো ছিল, কয়েকটা সবুজ সুতোয় বোনা ঘাস, সাতা সুতোর ফুল আর লাল সুতোয় লেখা- সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে.. আমি আটকে যাই। থমকে যাই। চমকে যাই। সেই প্রথম কৃষ্ণকলি। সেই প্রথম চন্দনাদি। আমার পিসিমা আর এরা কোথায় যেন মিলে মিশে একাকার.. গীত গাওয়া পিসিমা আমার। রেডিও শুনে শুনে নজরুল গীতি গাওয়া পিসিমা আমার। পিসিমা জানে না, জানবেও না, সেই আটপৌরে শাড়ি, লুকিয়ে শোনা রেডিও, চুপি চুপি গাওয়া গান সব তার অক্ষয় হয়ে রয়ে গেছে কোথাও, আজও আছে সেই সব গান। সেই বান্ধানি আছে কিনা কে জানে। কথাগুলো এখন সুরে সুরে এখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে, সবখানে..
ছাপাখানা বদল হয়। সিডিবন্দী হয় আমার তিতাস। নির্মলেন্দু। শক্তি, আমি আর আমার কদমগাছ। সাগর হাত বাড়িয়ে দেয়। আরফান সঙ্গে থাকে। এলিফ্যান্ট রোড। কাঁটাবন। প্রেস। সূর্যের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশের আলো দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকে তিতাস। সূর্য ওঠে। আলো ফোটে, সকাল এগোয় দুপুরে। ভুত সওয়ার হয় ছাপাখানায়, তিতাস আছে, আমি নেই। আমি আবার ফুটপাথে। পরনে ঢাকাই শাড়ি, ছবির হাট, ফুটপাথ আর আমি। শেষমেশ নামহীন তিতাস হাজির হয় একুশে বইমেলায়। ধুলোয় বসে আমি, পরনে ঢাকাই শাড়ি। ভুলে যাই, মনেই পড়ে না কাউকে বলা বা ডাকার কথা। আমার বই। প্রথম বই। হুয়ত বা একমাত্র। আমার তিতাস। বড় নীরবে, নিঃশব্দে বয়ে যায় একুশে বইমেলায়। কৃষ্ণাদি অনুযোগ করে, ডাকলে না.. আমার মনেই ছিল না, কাউকে বলা যায়, ডাকা যায়, গান-বাজনা বা নিদেন একটু প্রকাশের অনুষ্ঠান! কিছুই নেই। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছুটি নেই.. আমার বন্ধুরা, আমার স্বজনেরা, আমার গুরু, কেউ নেই.. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল! আমি তো কাউকে ডাকিইনি। আসলে ডাকার কথা মাথায়ও আসেনি যে..
দিন তারিখ হিসেব করলে সেদিনের সমস্ত কিছু আজ'গতকাল হয়ে গেছে। বা গত বছর বা তারও আগের বছর। সমস্ত কিছু আজ স্মৃতি। কাল, পরশু বা তারও আগেকার স্মৃতি। আমিই শুধু স্মৃতিতে বাঁচি। সবকিছু, সবটুকু তাই আগলে বসে আছি আজও, এখনও। আমাকে ছেড়ে যায় না সেসব কিছুতেই, কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ে না..
আমি ভাবতাম বা ভাবি আমি স্মৃতিতে বাঁচি। আসলে তা নয়, আমি শুধু আজকেই বাঁচি। শুধু আজকে। আজ-কে নিয়ে.. কোনো ভূত, কোনো ভবিষ্যত কিস্সু নয়, নেই, আছে শুধু আজ আর কিছু স্মৃতি কথকতা...
০৫।০৩।২০১২
Sunday, 13 May 2012
সব চরিত্র কাল্পনিক
মাঝে মাঝে একটা
ঘর দেখি –দেখতে পাই। ঘর না,
আসলে বাড়ি। পুরনো বাড়ি। পুরনো সেই বাড়ি। সেখানে হয়ত বা জন্মান্তরে বসত ছিল
আমার। বাড়িটা কেমন যেন পালটে পালটে যায়, ঘরগুলোও, এভাবে কখনও বাড়ি-ঘর পালটে পালটে যায়? কী জানি.. পালটে যায় দেওয়াল এমনকি পালটে যায় মানুষগুলোও। আমি মাঝে মাঝে
যাই সেই বাড়িতে, যেমন আজ এসেছি। কেন যে যাই নিজেও জানি না কিন্তু যাই, না গিয়ে পারি না বলেই যেন যাই সেখানে, যেখানে হয়ত বা কোনো এক জনমে বসত ছিল আমার। সেখানে এখন বাস করে অন্য মানবী, বাতাসে
অন্য শিশুর কলতান। সেই মানবী বসে আনাজ কোটে, কেরোসিনের
স্টোভে রান্না করে। এই স্টোভটা আমার চেনা। এর প্রতিটা সলতে আমার পরিচিত। চেনা এই
আঙিনা, অচেনা শুধু ওই মানবী আর ওই শিশুটি।
একটি পুরুষ আসে, একে আমি চিনি না। হঠাৎ করে সব কেমন অচেনা
হয়ে যায়। ভয় লাগতে শুরু করে। বাড়ির দেওয়ালটাও হঠাৎই বদলে যায়। একটা বাঁশের বেড়া
দিয়ে ঘেরা আঙিনা হয়ে যায় দেওয়াল ঘেরা ছোট্ট সেই উঠোন, যেখানে
এক অপরিচিত নারী বসে আনাজ কোটে, রান্না করে আমার চেনা
স্টোভে। আমার ভীষণ ভয় লাগে, আমি পালাতে চাই। জোরে হাঁটতে যাই,
পারি না। প্রচণ্ড ভারী লাগে পা দুটো। দৌড়ুতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ি।
অচেনা সেই পুরুষটি এসে আমার হাত ধরে, ফলাকাটা এক ছুরি দিয়ে
চিরে চিরে দেয় আমার দুই হাত, কনুই অব্দি, কনুইয়ের
উপরেও চিরে দিতে থাকে একের পর এক। খুব গভীর নয় সেই সব ক্ষত, যেন ছুরি দিয়ে
সে নকশা কাটে আমার হাতে, রক্তের রেখায় ফুটে ওঠে রঙ। আমি কাঁদতে থাকি, যেতে দাও, আমাকে যেতে
দাও -বলে অনুনয় করি, সে আমার হাত ছাড়ে
না। রক্তের রেখা আমার দুই হাতে, অদ্ভুতভাবে রক্ত জমাট বেঁধে
যেতে থাকে সেই চেরা জায়গাগুলোর উপরেই, গড়িয়ে নামে না।
নির্বিকার চিত্তে সেই অপরিচিত নারী আনাজ কোটে, শিশুটিকে
ডাকে। আমি তাকে বলি, আমাকে ছেড়ে দিতে বলো, আমার ভয় করছে, আমি বাড়ি যাব। সে হাসে, বলে, বাড়ি? তোমাকে তো ও বাড়ি
যেতে দেবে না, একবার পালিয়ে গেছ, আর
তোমাকে পালাতে দেবে না ও।
বাঁশের বেড়ার ওধারে কার যেন সাড়া পাই, তাকিয়ে দেখি ভীষণ চেনা দুটো মানুষ। ভারী, প্রায় অচল হয়ে যাওয়া পায়ে দৌড়ুনোর চেষ্টা করি, পারি না, তাও একসময় পৌঁছেই যাই বাঁশের গেটের কাছে, যেখানটায় গেটের বাইরে আমার ভীষণ চেনা মানুষ দুটো দাঁড়িয়ে আছে। আবার হুট করে সব পালটে যায়। সামনে সেই দেওয়াল! পুরনো বাড়ির পুরনো সেই দেওয়াল, মাঝখানে সদর দরজা। পুরনো কাঠের নড়বড়ে সেই সদর দরজায় শেকল তোলা, পেছন ফিরে তাকাই, ওই অচেনা মানুষটাকে হঠাৎ করেই চিনতে পারি, এ যে ভীষণ চেনা এক মুখ! শেকল নামিয়ে আধভাঙা নড়বড়ে দরজা পেরিয়ে আবার তাকাই পেছন ফিরে, পেছনে যারা আছে, তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। শিশুটি একই ভাবে খেলে বেড়ায় আঙিনা জুড়ে, বটিতে আনাজ কোটে এক অপরচিত নারী, পাশে রাখা স্টোভে রান্না হয়, ঘরের দরজা পেরিয়ে যে সিঁড়ি তাতে বসে এক অচেনা মানুষ, যাকে আমি কোনোদিন দেখিনি, যাকে আমি চিনি না..
Labels:
মনখেয়াল
Tuesday, 7 February 2012
বেদনার রং নাকি নীল??
সেদিন কে যেন বলল আমায়, জানো তুমি, বেদনার রং যে নীল? আমি
বললাম, তাই নাকি!! দেখিনিতো কখনও। সে বলল, দেখার জন্য কষ্ট পেতে হয়। ভাবলাম আমি, তাইতো, তবে কি কষ্ট পাইনি এ যাবত?? ভাবনার খাতা খুলে ভাবতে বসলাম আমি। স্মৃতির অধ্যায় হাতড়ে- হাতড়ে, উল্টে
পাল্টে দেখলাম, কই, এখানে
তো অনেক কষ্ট জমা আছে। ছোটবেলায়
বায়না ধরেছিলাম, আমায় একটা সাইকেল কিনে দিতে হবে। রোজই বাবার কাছে
বায়না ধরতাম। বাবা
কিনে দেয়নি
আমায়। কেন দেয়নি, তখন বুঝিনি, বুঝিনি বাবার মনের সেই গোপন কথা। শুধু
ভাবতাম বাবাটা খুব পচা। বাবা
বলত, যেদিন তুই বাবা হবি, সেদিন বুঝবি। আজ
আমার মেয়ের বায়না, একটা
সাইকেলের, ইচ্ছে করে কিনে দিতে, আবার এক অজানা ভয় এসে ভর করে মনে, হয়ত বাবার মনেও এই ভয়ই ছিল। আরেকটু যখন বড় হলাম, খুব শখ হল, একটা মোটর সাইকেল কিনব। আবারও বায়না বাবার কাছে, বাবা মোটর সাইকেল কিনে দেননি। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আরও বায়না ছিল একটা
কম্পিউটারের। অনেকটা দিন বাবার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিলাম। বাবার শুধু একটাই কথা ছিল, বাজান, তুমি আরেকটু বড় হও। হঠাৎ একদিন আমার বায়নার প্রথম অর্জন কম্পিউটার পেলাম হাতে। যতগুলো কষ্ট আগের জমা
ছিল মনে। সেগুলোকে
এই আনন্দের সাথে
যোগ বিয়োগ গুন ভাগ করে নিঃশেষ করে দিয়েছিলাম সেদিন। এরপর যখন দেখতাম, বন্ধুরা অনেক বান্ধবী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, খুব একা একা লাগত, খুব কষ্টও
লাগত। হঠাৎ একদিন পেয়ে গেলাম আমার প্রিয়তমাকে। ওর সাথে পাড়ি দেওয়া দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়, কট পাওয়া না পাওয়ার কষ্ট জড়িত, তা বলে পাতা ভারী করতে চাই না। শুধু বলি, 'প্রেমের নাম বেদনা' এটা সঙ্গত কারনেই বলে মানুষ। একদিন আচমকা জানলাম যে আমি বাবা হতে যাচ্ছি, পুরনো সব ব্যাথা গুলোতে সেদিন মলম দিয়ে সারিয়ে তুলেছিলাম। যেদিন আমার ছোট্ট
তারা এই পৃথিবীতে এলো, সেদিন আমি পুরনো কোন কষ্ট আর মনে করতে পারছিলাম না। আজও অনেক পাওয়া না পাওয়া জুড়ে রয়েছে জীবনে। অনেক কষ্টও আছে। কিন্তু কেন তবে আমি
কষ্টের নীল
রং দেখলাম না!!! ভাবতে ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রা চলে এলো। ঘুমের ঘোরে দেখলাম এক আজব দুঃস্বপ্ন। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে, জেগে উঠলাম। হঠাৎ ই বুঝতে পারলাম, কেন আমি কষ্টের রং দেখিনি!! লিখতে বসলাম, লিখতে লিখতে আরও স্পষ্ট হতে থাকল কারণটা। বুঝতে পারলাম যে না পাওয়ার
কষ্টের চেয়ে পাওয়ার আনন্দের
ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই
কষ্টের নীল আমার চোখে ধরা দেয়ার সুযোগ পায়নি। অজান্তেই
বেরিয়ে এলো দুটি লাইন,
টক হোক আর ঝাল হোক, জীবনের এই টেস্ট
বেঁচে আছি আজ থাকবও বেঁচে, লাইফ অল দ্য বেষ্ট
টক হোক আর ঝাল হোক, জীবনের এই টেস্ট
বেঁচে আছি আজ থাকবও বেঁচে, লাইফ অল দ্য বেষ্ট
Labels:
মনখেয়াল
Wednesday, 27 July 2011
"আশাবাদী মন"
ইমরান আল হাসান
আশা সে তো মরীচিকা
শুনেছি অনেক অনেক বার
কিন্তু কেন?
মানুষ তো আশাতেই বাঁচে।
যার আশা নেই
সে আসলে বাঁচবে কি নিয়ে?
অনেককেই দেখেছি,
আশায় আশায় অনেক বেলা করে,
আশায় বুক বাঁধে, স্বপ্ন দ্যাখে
আমিও দেখি........
আর কিছু না বুঝলেও এতটুকু বুঝি
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।
ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি
কিছু নিরাশাবাদী কথা
তাইতো এ মন আশাবাদী হয় না,
প্রচণ্ড ভয় পায় এ ভীতু মন।
বামন হয়ে চাঁদের পানে হাত বাড়িও না,
ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখো না,
এই সকল কথা গুলো ঘুরে ফিরে,
মনকে ক্ষত বিক্ষত করে দিয়ে যায়।
তবে কি বামন হওয়াটা অপরাধ
না ছেঁড়া কাঁথায় শোয়া টা।
আমার আশাবাদী মন বলে
এদুটোর কোনটাই অপরাধ নয়,
অপরাধ শুধু ভয় পাওয়াতে।।
********************
Labels:
মনখেয়াল
Subscribe to:
Posts (Atom)

